ডেস্ক রিপোর্ট: ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সামনে দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব আয়াত নির্বাচন ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও পক্ষের প্রতি তেহরানের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তিন দিন ধরে খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। এ সময়ে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সংগঠনগুলোর জন্য মূলত শাহাদাত, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা এবং চূড়ান্ত বিজয়সংক্রান্ত আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী বা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা, আত্মসমালোচনা বা নৈতিক শিক্ষা বহনকারী আয়াত বেছে নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা জানাতে এলে সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। আয়াতটি বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে সংখ্যায় কম মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াত নির্বাচন সৌদি আরবের প্রতি ঐতিহাসিক স্মরণ, কূটনৈতিক ইঙ্গিত কিংবা সূক্ষ্ম বার্তা—সবকিছুরই প্রতিফলন হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা আলে ইমরানের ১৬৯-১৭০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। এতে আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত নয়, বরং জীবিত ও মহান প্রতিদানপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং তালেবানের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোতে শহীদদের মর্যাদা, আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারে অবিচল থাকা এবং চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা গুরুত্ব পেয়েছে।
হিজবুল্লাহর জন্য এমন আয়াত পাঠ করা হয়, যেখানে সত্যিকারের মুমিনদের বিজয়ের প্রতিশ্রুতি এবং কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে শহীদ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। হুতিদের জন্য সূরা আল-ফাতহ ও সূরা আলে ইমরানের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও আল্লাহর পথে অবিচল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ ও তালেবানের জন্য সূরা আল-ফাতহর সূচনাংশ তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’-এর সুসংবাদ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একই আয়াত ব্যবহারের মাধ্যমে এই দুই পক্ষকে ইরানের আদর্শিক বলয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিসরের জন্য তুলনামূলক শান্ত ও নৈতিকতাকেন্দ্রিক আয়াত নির্বাচন করা হয়। এসব আয়াতে ন্যায়পরায়ণতা, অন্তরের প্রশান্তি, ধৈর্য এবং পরকালের পুরস্কারের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জন্যও আলাদা বার্তাবাহী আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। কাতারের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা, তুরস্কের ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের গুরুত্ব এবং পাকিস্তানের জন্য সম্মানজনকভাবে পথচলার দোয়া পাঠ করা হয়।
লেবানন সরকারের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়াতের মাধ্যমে দেশটির সরকারের ভূমিকার প্রতি পরোক্ষ সমালোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা হিজবুল্লাহর জন্য পাঠ করা প্রশংসাসূচক আয়াতের সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানটি শুধু রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ছিল না; বরং দেশভেদে ভিন্ন কোরআনের আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে ইরান তার কূটনৈতিক অবস্থান, মিত্র-প্রতিদ্বন্দ্বী মূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক বার্তাও তুলে ধরেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে তেহরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। একই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন। পরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
