রেলের ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প বাস্তবায়নে শত শত কোটি টাকা লোকসানের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব।
রেলের বিভিন্ন প্রকল্প, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নে ভুলের কারণে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রেলপথ ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। এসব অনিয়ম ও ভুল সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল হলিডে ইনে আয়োজিত এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রেলের দীর্ঘদিনের প্রকল্প ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানেন কোথায় ভুল, কোথায় সিদ্ধান্তহীনতা এবং কোথায় বাস্তবায়নে গাফিলতি রয়েছে। এরপরও এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে, যার কারণে রাষ্ট্রকে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
রেলের প্রকল্প ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার উদাহরণ দিয়ে হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, হুইলচেয়ার ও ট্রলির জন্য বেসরকারি সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। অথচ রেলের ওয়াশ প্ল্যান্টের ভুল পরিকল্পনার কারণে সরকারকে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডেমোর ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থের ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি ১২৫টি ওয়াগন এনে ফেলে রাখা হয়েছে।কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আনা লোকোমোটিভের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ৩০ থেকে ৪০টি লোকোমোটিভ আনার পর বেয়ারিং সমস্যার কারণে সেগুলো পড়ে রয়েছে। এতে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এসব ক্ষতির দায় কে নেবে—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব সিদ্ধান্ত ও প্রকল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকে এখনো কোনো না কোনোভাবে কর্মরত রয়েছেন, আবার অনেকে অবসরে গেছেন। রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের ক্ষতির জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রেলের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের সঙ্গে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো আচরণ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য রেলসেবাকে আরও সহজলভ্য করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো প্রতিবন্ধী যাত্রী স্টেশনে প্রবেশ করলে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাদানকারীদের এগিয়ে এসে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।নতুন রেল প্রকল্পে শুরু থেকেই প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আলাদাভাবে এসব সুবিধা যুক্ত করার পরিবর্তে পরিকল্পনার শুরুতেই স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও টিকিটিং ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা রাখতে হবে।
বিদ্যমান স্টেশনগুলোও পর্যায়ক্রমে উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। সব স্টেশন একসঙ্গে সংস্কার করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসিটি ও ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন এবং বেশি যাত্রী ব্যবহার করেন—এমন স্টেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন।
নতুন কোচে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চলাচলের সুবিধা, প্রবেশগম্য টয়লেট, পর্যাপ্ত দরজা ও হ্যান্ডরেল নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে এবং কোনো স্থাপনা নির্মাণের পর প্রতিবন্ধী যাত্রীরা সেটি বাস্তবে ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।তিনি বলেন, এই উদ্যোগ যেন শুধু আলোচনা ও প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এর ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে এবং প্রতিটি কাজের জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
রেলের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়াশরুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ফ্যান সচল রাখা, ট্রেনে ওঠার সময় হুইলচেয়ার ও ট্রলির ব্যবস্থা করা এবং যাত্রীছাউনি ও ওয়েটিং রুমগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, রেলের বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ন্যূনতম যাত্রীসেবাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং ব্র্যাকের পরিচালক (সড়ক নিরাপত্তা) আহমেদ নাজমুল হুসাইন।
