মো. তারেক হোসেন
দেশে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা সাধারণত জুনের শেষ থেকে আগস্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দেশের অধিকাংশ এলাকায় বর্ষার ভরা মৌসুম থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে গুরুত্বপূর্ণ এই বোর্ড পরীক্ষায় এবারো চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে পড়িক্ষার্থীদের। দেশব্যাপী ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, পাহাড় ধস কিংবা বন্যা—এ সময়টাতে প্রতিবছর যেকোন দুর্যোগই অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ বাড়ায়। এর ফলে কোনো না কোনো অঞ্চলে পরীক্ষা আয়োজন, প্রশ্নপত্র পরিবহন ও পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের একাডেমিক ক্যালেন্ডার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ দেশই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরীক্ষা আয়োজন করলেও বর্ষার ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা করে।
ভারতে ‘কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ড (সিবিএসই)’ সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে দ্বাদশ-সমমান শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা নেয়। অধিকাংশ রাজ্য বোর্ডও ফেব্রুয়ারি-মার্চ বা মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করে। ফলে জুনে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
পাকিস্তানে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ‘হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসএসসি)’ পরীক্ষা সাধারণত এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। কিছু প্রদেশে সামান্য তারতম্য থাকলেও অধিকাংশ লিখিত পরীক্ষা বর্ষার তীব্র সময়ের আগে শেষ হয়ে যায়।
হিমালয় কন্যা নেপালে ‘জাতীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পরীক্ষা (গ্রেড-১২)’ সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) মাসে অনুষ্ঠিত হয়। জুনের মাঝামাঝি থেকে মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে অধিকাংশ পরীক্ষা শেষ করার চেষ্টা করা হয়।
দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় ‘জিসিই অ্যাডভান্স লেভেল (এ/এল)’ পরীক্ষা দীর্ঘদিন নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাবর্ষের পরিবর্তনের কারণে এটি সাধারণত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে সাধারণ পরিস্থিতিতে দেশটি বর্ষার প্রধান মৌসুমে জাতীয় পরীক্ষা আয়োজন করে না।
ভুটানে ‘উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সনদ (বিএইচএসইসি)’ পরীক্ষা সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়। যদিও এ সময় কিছু এলাকায় বর্ষার শেষ ভাগ থাকে, তবুও বাংলাদেশের মতো প্রবল মৌসুমি বৃষ্টির সময় পরীক্ষা পড়ে না।
মালদ্বীপে ‘কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল এ-লেভেল’ পরীক্ষার সূচি অনুসরণ করা হয়। প্রধান পরীক্ষা মে-জুন এবং অক্টোবর-নভেম্বর—দুই সেশনে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বীপভিত্তিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের কারণে দেশটির পরিস্থিতি বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষা বর্ষাকালে হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বছরের শুরুতে এসএসসি পরীক্ষা, এরপর উত্তরপত্র মূল্যায়ন, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি, শ্রেণি কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষা ক্যালেন্ডার গড়ে উঠেছে। ফলে একটি ধাপ পরিবর্তন করলে পুরো শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হয়।
তবে বর্ষাকালে পরীক্ষা আয়োজনের কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে পরীক্ষার্থীদের সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর, উপকূল ও পাহাড়ি জেলার শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়, ফলে পুরো পরীক্ষা সূচি পিছিয়ে যায়। তৃতীয়ত, প্রশ্নপত্র পরিবহন, পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় ও ঝুঁকি তৈরি হয়। চতুর্থত, টানা বৃষ্টি ও উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক চাপও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে কিছু ইতিবাচক যুক্তিও রয়েছে। জুন-জুলাইয়ে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান সম্পন্ন হয়ে যায় এবং কৃষিনির্ভর পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি তুলনামূলকভাবে পরীক্ষার উপযোগী সময় বলে শিক্ষা প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম একই শিক্ষাবর্ষে সম্পন্ন করতেও বর্তমান ক্যালেন্ডার সহায়ক।
শিক্ষাবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় পরীক্ষা ক্যালেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে। যদি ফেব্রুয়ারি বা মার্চে এসএসসি এবং মে-জুনে এইচএসসি সম্পন্ন করা যায়, তাহলে বর্ষাজনিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তবে এজন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো একাডেমিক বর্ষ, শিক্ষক নিয়োগ, ফল প্রকাশ, ভর্তি প্রক্রিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালেন্ডারের মধ্যে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায়, জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এমন সময়ে আয়োজন করা অধিকতর কার্যকর, যখন আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা কম থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জলবায়ু ঝুঁকি, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।
