মো: ফয়সাল আহমেদ: একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এক আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে আজ বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রধান অংশ এই অঞ্চল ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় শক্তিসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এই বৃহৎ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভেতরে বাংলাদেশও তার ভূ-অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশিদার হিসেবে উঠে আসছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এটি দ্রুতই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি অনুসারে, প্রশান্ত মহাসাগরের মার্কিন উপকূল থেকে শুরু করে গোটা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশিত ফরেন পলিসি হোয়াইট পেপার -এ বলা হয়েছিল, পূর্ব ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত অঞ্চলকে ইন্দো-প্যাসিফিক নামে অভিহিত করা যায়।
এই অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এর বিস্তৃত সমুদ্রপথ, কৌশলগত প্রণালী, বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ এবং সমুদ্রসম্পদ। বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ইন্দো-প্যাসিফিকের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটিকে অপরিহার্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে এখানে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহের জটিল নেটওয়ার্ক, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
একসময় ইউরোপ ছিল বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র। পরে স্নায়ুযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী দশকগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে তেল সম্পদকে ঘিরে। কিন্তু গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের গুরুত্বকে ছাপিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক উঠে এসেছে নতুন বৈশ্বিক রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। বর্তমানে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিজেদের বৈশ্বিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে। একারণে ২০১১ সালে ওবামা প্রশাসন ঘোষণা করে “রিব্যালেন্সিং টু এশিয়া” নীতি, যা ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রসারিত করে “ইন্দো-প্যাশিফিক স্ট্র্যাটেজিক ভিশন” হিসেবে চালু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব সীমিত করা এবং একটি “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক” গড়ে তোলা।
অন্যদিকে, চীন ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর নেতৃত্বে ঘোষণা করে বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের প্রায় ৬০টিরও বেশি দেশকে বাণিজ্য ও অবকাঠামোর মাধ্যমে সংযুক্ত করতে চায়। এর একটি বড় অংশ হলো মেরিটাইম সিল্ক রোড, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।
এই প্রতিযোগিতায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নয়, বরং জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলিও সক্রিয়। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করেছে। ফলে এই অঞ্চল এক বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির মূল কেন্দ্র। ভারত মহাসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যেখানে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য মালাক্কা প্রণালীসহ একাধিক কৌশলগত পথ রয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে তার প্রভাব বাড়াতে বিভিন্ন বন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে—যেমন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর বা পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দর।
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখতে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে ভারত তার “এক্ট ইস্ট পলিসি” এবং জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে চীনের প্রভাবকে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর আজ বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার অন্যতম মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
এই জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। চীন ও ভারতের মাঝামাঝি ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্নিকটতা এবং সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক মূল্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২৩ সালে নিজেদের “ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক” প্রকাশ করেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“সবার জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি ও অংশীদারিত্ব”। এই নীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত মূলনীতি—“সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”—এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও অংশীদারিত্ব জোরদার করছে।
এই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। সমুদ্রবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক “লজিস্টিক হাবে” পরিণত হতে পারে, যা রপ্তানি ও আমদানিকে গতিশীল করবে। একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস, খনিজ ও সামুদ্রিক সম্পদের অনুসন্ধান দেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা দেবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস খুলে দেবে।
এছাড়া আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সহজতর হবে, যা উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য। সকল দেশের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার করাই হবে বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে এখানে বাংলাদেশকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ যেমন অপরিহার্য, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এ দ্বৈত সম্পর্ক পরিচালনা কূটনৈতিক দক্ষতার বড় পরীক্ষা।
এছাড়াও সামুদ্রিক নিরাপত্তাহীনতা—যেমন জলদস্যুতা, অবৈধ মৎস্য আহরণ ও মানবপাচার—বাংলাদেশের সামুদ্রিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ কাজে লাগাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নত অবকাঠামো অপরিহার্য। তাই বলা যায়, সম্ভাবনা যত বড়ই হোক, সঠিক নীতি ও কৌশল ছাড়া বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতিতে তার আকাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিয়ে আসতে পারবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল শুধু ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতার কারণে এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক শক্তির সক্রিয় ভূমিকা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহ এই অঞ্চলকে নতুন বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে রূপান্তরিত করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। সঠিক কূটনৈতিক কৌশল, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।
*লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
