নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে। সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিরাজ করছে এক ধরনের নির্বাচনী আমেজ। তবে একইসাথে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে কিছু অনিয়মের অভিযোগও উঠছে।
ভোট দিয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডাকসুর ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, “আমি সবার কাছে আহ্বান জানাই, আপনারা আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের বেছে নিন। ডাকসু হলো শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার মঞ্চ, তাই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।” তবে তিনি অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন। তার ভাষায়, “আমরা সকালে এসে দেখতে পাই, এখানে একটি ছাত্র সংগঠন ১০০ মিটারের ভেতরে ডেস্ক বসিয়ে শিক্ষার্থীদের স্লিপ দিচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।” সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ছাত্রদলের কিছু প্রার্থীকে এ কাজে সম্পৃক্ত অবস্থায় তিনি দেখেছেন।
কেমন নেতৃত্ব চান এমন প্রশ্নে ভোটারদের মতামত ছিল বৈচিত্র্যময়। কলা অনুষদের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “আমরা চাই এমন নেতৃত্ব যারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবে। রাজনৈতিক দল বা কোনো এজেন্ডা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়বান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।” অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী রূপা আক্তার জানান, “ডাকসুর প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারে, তাহলেই এই নির্বাচন সফল হবে।”
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ভ্রাম্যমাণ টিম নিয়োজিত রয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা চাই এই নির্বাচন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করুক। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি অনুষদ ভবনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল উৎসাহব্যঞ্জক।
নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোতে তরুণ ভোটারদের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। অনেকেই জীবনের প্রথম ভোট দিয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে। আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার বলেন, “প্রথমবার ভোট দিচ্ছি। অনেক ভালো লাগছে যে আমাদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।”* আরেক শিক্ষার্থী ফারহান হোসেন বলেন, “আমরা চাই নির্বাচিতরা যেন ছাত্রজীবনের সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেয়। আবাসন সংকট, পাঠাগারের সময়সূচি, গবেষণা সহায়তা এসব বিষয় নিয়েই আমাদের প্রধান দাবি।”
তবে নির্বাচন ঘিরে অভিযোগের শেষ নেই। সরকারি দল ও বিরোধী শিবির উভয়পক্ষ থেকেই একে অপরের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিছু প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট হলে প্রভাব খাটানো হয়েছে। একইসাথে দেখা গেছে কিছু কেন্দ্রে ধীর গতিতে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে, যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত কারণে কোথাও কোথাও বিলম্ব হলেও সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর ডাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তরুণ সমাজের দাবি দাওয়া ও ভবিষ্যতের পথরেখা এ নির্বাচন প্রভাবিত করতে পারে। শিক্ষক সমাজের অনেকেই মনে করছেন, ডাকসু যদি দলমুক্তভাবে কাজ করতে পারে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় তা সহায়ক হবে।
সকাল থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে চলা ডাকসু নির্বাচন দিনের বাকীটা সময়ও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা যায়। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, যেই নেতৃত্বই নির্বাচিত হোক না কেন, তারা যেন সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন এবং ডাকসুকে একটি প্রাণবন্ত মঞ্চে পরিণত করেন।
