মো: ফয়সাল আহমেদ: ইসরাইল গাজা যুদ্ধ, যা বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির একটি জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, এটি শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়, বরং শক্তির রাজনীতির একটি নিষ্ঠুর প্রকাশ। গাজার আকাশে নিয়মিত বোমাবর্ষণ, ধ্বংসপ্রায় হাসপাতাল, অন্ধকারে নিঃস্ব মানুষ, ক্ষুধার আর্তনাদ, অসহায় মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়াস এই সকল দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছে যে মানবাধিকারের মৃত্যু হয়েছে শক্তির রাজনীতির কাছে।
বর্তমান ইসরাইল-গাজা সংঘাত আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, বরং এই সংঘাতের শিকড় অনেক গভীর ও জটিল। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের সাথে স্বাধীনতা ও ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় এবং শক্তির রাজনীতির কাছে ফিলিস্তিনের মানুষ ক্রমাগতভাবে হারিয়েছে তাদের ভূমি। দীর্ঘদিন যাবত গাজা উপত্যকা অবরোধ এবং দমননীতির শিকার তারা। ইতিহাসে ইসরাইল-হামাস সামরিক সংঘাত নিয়মিত হলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধ নজিরবিহীন ধ্বংস এবং চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ইজরাইলি বাহিনীর দখলদারিত্বের কারণে গাজা ভূখণ্ড বর্তমানে এক “উন্মুক্ত কারাগারে “পরিণত হয়েছে। বর্তমান পৃথিবীতে নিজ ভূমিতেই “পরবাসী” হিসেবে তারা বিবেচিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই ইজরাইলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ই অক্টোবর ২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরাইলে এক অতর্কিত হামলা চালায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে তখন থেকে প্রতিশোধ হিসেবে ইসরাইল গাজায় নজিরবিহীন সামরিক অভিযান শুরু করে, ফলে নিহতের সংখ্যা গাজায় দিন দিন বেড়ে চলেছে। আল-জাজিরার মতে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬২ হাজার। এছাড়াও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৮৩ হাজারেরও অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে গাজায় এবং আহতদের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ৭০% নারী ও শিশু। এছাড়াও স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ধর্মীয় স্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক সাইটগুলোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, গাজার হাসপাতালে ৯৪% বা তারও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত, ফিলিস্তিনে ৩৬ টি হাসপাতালে মধ্যে বর্তমানে ১৯টি হাসপাতাল কার্যকর রয়েছে, যেগুলোর শয্যা সংখ্যা মাত্র ২,০০০, যা ২ মিলিয়নের অধিক মানুষের জন্য প্রায় অপ্রতুল। নিয়মিত বোমাবর্ষণ, ড্রোনহামলা গাজার জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
এই ইসরাইল-গাজা সংঘাতটি শুধুমাত্র দুই পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ; বরং এটি আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতির একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। ইসরাইলের পিছনে পশ্চিমা বিশ্বের অবিচল সমর্থন এই যুদ্ধের গতিপথ কে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত ইসরাইলকে যে অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, তার মধ্যে রয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্র, যা ব্যবহৃত হচ্ছে নিরীহ মানুষ, নারী ও শিশুর উপর। বিশ্ব দরবারে মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো আর পর্দার আড়ালে নিজেদের স্বার্থে এই গণহত্যা কে বৈধতা ও সহায়তা দিয়ে দ্বিচারিতা এবং শক্তির রাজনীতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং আধিপত্য বিস্তারের চাহিদা মানবাধিকারের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
অন্যদিকে হামাসের পিছনেও ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন রয়েছে, তারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে নিজেদেরকে যুদ্ধে জড়িয়ে রেখেছে, ফলস্বরূপ গাজার সাধারণ মানুষ এ শক্তির খেলায় নিজেরা পিষ্ঠ হচ্ছে ।
এই ইসরাইল-গাজা সংঘাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলি বিশ্ব বিবেককে বর্তমানে ব্যাপকভাবে নাড়া দিচ্ছে। নির্বিচারে বোমাবর্ষণ, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিশু হত্যার মতো ঘটনা গুলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও জেনেভা কনভেনশনের নীতিগুলোকে বারবার লঙ্ঘিত করছে। ” দ্য গার্ডিয়ান -এর অনুসন্ধানে ইজরায়েলি সামরিক ডাটা থেকে জানা যায়, যুদ্ধে নিহতদের ৮৩%- এর বেশিই সাধারণ মানুষ”, অর্থাৎ কোন অপরাধ এবং যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অনেক কর্মীকে হত্যা করা হচ্ছে এই যুদ্ধে।
দখলদার ইসরাইলি বাহিনী গাজাকে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করে রেখেছে, ফলে খাদ্য-বিদ্যুৎ ও পানি সংকট ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক প্রধান মার্টিন- গ্রিফিথস বলেছেন “গাজায় ত্রাণ সরবরাহ সবচেয়ে কম পর্যায়ে পৌঁছেছে “।এক বেলা খাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ চাতক পাখির মত ত্রানবাহী গাড়ির দিকে চেয়ে থাকে, কখনো গাড়ি পৌঁছালেও খাবার নিয়ে বাসায় পৌঁছানোর নিশ্চয়তা থাকে না তাদের, বোমা বর্ষণ থেকে শুরু করে ড্রোনের মাধ্যমে মানুষকে সনাক্ত করে হত্যা করা হচ্ছে। নিয়মিত বোমা এবং গুলি বর্ষণে গাজাবাসী নির্ঘুম রাত পার করছে। এই অবরোধ এবং সামরিক অভিযানের ফলে গাজার জীবনযাত্রা অসনীয় হয়ে উঠেছে। অপরদিকে দুঃখজনক ভাবে বিশ্বশক্তিগুলো ন্যায়বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। মানবাধিকারের প্রতি এই অবহেলা মানব সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জাতিসংঘের মতো সংস্থা, যেগুলো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বৃহৎশক্তির দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে এর যুদ্ধ বন্ধে তারা নিরুপায়, নিন্দা এবং শোক জানানোর মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। এসব রাষ্ট্রের স্বার্থের কাছে গাজাবাসীর জীবন হয়ে উঠেছে মূল্যহীন।
গত ২২ আগস্ট ২০২৫ এ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা সিটি দখলের অনুমোদন দিয়েছেন, এবং গাজা সিটি দখলের প্রথম ধাপ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন করে জরালো সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা যদি সফল হয় তবে বিশ্ব এক নজিরবিহীন মানবতাবিরোধী অপরাধের নিষ্ক্রিয় সাক্ষী হবে।
ইসরাইল-গাজা সংঘাতে শক্তির রাজনীতি মানবাধিকারকে পদদলিত করেছে। ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন তাদের নির্বিচারে হামলার সুযোগ করে দিয়েছে, অন্যদিকে হামাসের সহিংস প্রতিরোধ ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। এই চক্র ভাঙতে হলে টেকসই যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা জরুরি, যেমন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হওয়া যুদ্ধবিরতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, সাথে গাজার অবরোধ তুলে নিয়ে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসহ মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষা করে ন্যায্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দিকে এগোতেই হবে।শান্তি ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শক্তির রাজনীতির ঊর্ধে উঠে মানবাধিকার কে প্রাধান্য দিতে হবে।
*লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
