
জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাহাজভাঙা শিল্পকে লাল শ্রেণি থেকে কমলা শ্রেণিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শিথিল হওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিবেশদূষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত কমিটি জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রেণি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে গঠিত কমিটির সভাপতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। কমিটিতে শিল্পমন্ত্রী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা থাকলেও কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়নি।বর্তমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, জাহাজভাঙা কার্যক্রম ও ইয়ার্ড লাল শ্রেণির শিল্প। এ শ্রেণির শিল্পের পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব পড়তে পারে বলে বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে নতুন ইয়ার্ড স্থাপনের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ), জনমত যাচাই এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে।শিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবি, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়ার কারণে তাঁদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড রয়েছে এবং প্রতিটিতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান মনে করেন, গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানো গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সুযোগ বাড়তে পারে।শ্রেণি পরিবর্তনের ফলে কমলা শ্রেণির শিল্পের জন্য প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রতিবেদন বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়ার নিয়ম প্রযোজ্য হবে। বিভাগীয় কার্যালয় প্রয়োজন মনে করলে ইআইএ করার সুপারিশ করতে পারবে, তবে সেই সুপারিশ মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এতে নতুন ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, বিধিমালা শিথিলের সিদ্ধান্ত জাহাজভাঙা শিল্পের দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা না করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উদ্বেগজনক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত আগস্টে গ্যাস নিঃসরণে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা শ্রমিকদের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ ভাঙা হয়। প্রতিটি জাহাজ ভাঙতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে এবং এসব ইয়ার্ডে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ফলে অনুমোদনপ্রক্রিয়া শিথিল হলে পরিবেশগত তদারকি, শ্রমিকের সুরক্ষা এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্পকে নিরাপদ করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত ড্রাইডক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। সরকারের সামনে এখন শিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
