ডেস্ক রিপোর্ট:অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি বহরে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে। এ সময় ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে জলপাই সংগ্রহে অংশ নিতে যাওয়া ৭৮ বছর বয়সী এক ফরাসি মেয়রকেও মারধর করা হয়। একই সময়ে পশ্চিম তীরে এক মার্কিন ফটোসাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায়ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে বাসস এ তথ্য জানিয়েছে।
ফরাসি মেয়র বার্নার্ড বোদুর ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে জলপাই সংগ্রহের সময় মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারীরা তার ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাকে লাথি মারা হয়, লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয় এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়। তবে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি তার।
ঘটনাস্থলে জেরুজালেমে নিযুক্ত ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের শীর্ষ প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পোল্যান্ডের কূটনীতিকেরাও উপস্থিত ছিলেন। উত্তর ফ্রান্সের অলনোয়া-এমেরি শহরের মেয়র বোদু বলেন, এ ধরনের আচরণের পেছনে ইসরাইল সরকারের প্রশ্রয় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি পশ্চিম তীরে অবস্থানরত ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরাইলের প্রতি এ ধরনের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান তিনি। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছেন।
এর এক দিন আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ফটোসাংবাদিক হেইডি লেভিন পশ্চিম তীরে হামলার শিকার হন। হামলায় তার মেরুদণ্ডের কয়েকটি কশেরুকা ভেঙে যায়। শনিবার তার শারীরিক অবস্থা মাঝারি পর্যায়ে ছিল বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে নতুন করে উত্তেজনা বা সংঘাত চান না।
নির্বাচনের আগে সহিংসতা
কূটনীতিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় তদন্ত শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটির পুলিশ।
তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কূটনীতিকদের চলাচলের বিষয়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত ছিল। তিনি ফরাসি মেয়র বোদুর রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
নেতানিয়াহুর প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট এ সহিংসতার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, সরকারের প্রশ্রয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে এবং এতে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফটোসাংবাদিক হেইডি লেভিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি হামলাটিকে ‘আপত্তিকর ও মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেন। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জলপাই সংগ্রহকে ঘিরে হামলা
ফরাসি মেয়র বোদু জানান, ফ্রান্স থেকে আসা একজন স্থানীয় যাজককে সঙ্গে নিয়ে তিনি পশ্চিম তীরের খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত তাইবে শহরে গিয়েছিলেন। সেখানে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা ছিল তাদের। ফিলিস্তিনি কৃষকদের প্রতি সংহতি জানাতে জলপাই সংগ্রহে অংশ নেওয়ার সময় তিনি হামলার শিকার হন।
ফিলিস্তিনিদের কাছে জলপাই শুধু কৃষিপণ্য নয়; এটি তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও কৃষকদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
তাইবের যাজক বাশার ফাওয়াদলেহ এএফপিকে জানান, বসতি স্থাপনকারীরা জলপাই সংগ্রহের সময় কৃষকদের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের কাছ থেকে জলপাই কেড়ে নেয়। পরে ফরাসি মেয়রকেও মারধর করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় একজনের মাথায় আঘাত লাগে এবং সেলাই দিতে হয়। এক বয়স্ক নারীও অপমান ও মারধরের শিকার হন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে জলপাই সংগ্রহ নিয়ে উত্তেজনা ও সহিংসতার খবর সংগ্রহের সময় এএফপির ফটোসাংবাদিক জাফর আশতিয়েও হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তার কয়েকটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপন অবৈধ বলে বিবেচিত। ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখল করে ইসরাইল। বর্তমানে ওই ভূখণ্ডে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী এবং প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন।
