নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন আসাদ রহমান। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষ, বই-খাতা—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে পড়াশোনা হয়তো সেখানেই থেমে যেতে পারত।
কিন্তু একজন বন্ধুর একটি সাধারণ অনুরোধ বদলে দেয় সেই গল্প। বন্ধুটি তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য সঙ্গে ডাকেন। আসাদও সাড়া দেন। অষ্টম শ্রেণির পর নবম শ্রেণিতে আবার শুরু করেন পড়াশোনা। তবে এবার সাধারণ ধারায় নয়, কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে।
সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তই কয়েক বছর পর তাকে নিয়ে যায় বহুদূর। ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন আসাদ। সেখানে কিয়ংসুং বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল বিজনেস বিষয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন তিনি।
১৪ বছর বয়সে যে তরুণ শিক্ষাজীবন থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছিলেন, তার জন্য এ যাত্রা নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তনের গল্প। তবে আসাদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তিনি কোথায় পৌঁছেছেন তা নয়; বরং সেখানে পৌঁছাতে তাকে কতবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে।
সাফল্যের গল্প সাধারণত শেষ থেকে শুরু করে বলা হয়। বিমানবন্দরের ছবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার খবর কিংবা নতুন কোনো পেশাগত পরিচয় দিয়েই শুরু হয় সেই গল্প। এরপর অতীতের ঘটনাগুলোকে সাজানো হয় একটি সরল পথের মতো করে।
আসাদের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে তাকে কাজ করতে হয়েছে জেলেদের সঙ্গে। স্থানীয় বাজারে মাছও বিক্রি করেছেন। সামনে কী আছে, শিক্ষাজীবন আদৌ কোথায় গিয়ে থামবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তখন তার জানা ছিল না। ছিল শুধু পরের দিনটিকে পার করার চেষ্টা।
তবে পড়াশোনায় ফিরে আসার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
নারায়ণগঞ্জ টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কারিগরি শাখা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করেন আসাদ। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স (বিএসএস) ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনও পুরোপুরি নির্বিঘ্ন ছিল না। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, শুরু হয় অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম। প্রযুক্তিগত নানা সমস্যার কারণে তার স্নাতক সম্পন্ন করতেও সময় লাগে। তবে সেখানেও থেমে যাননি তিনি।
শিক্ষাজীবনেই নেতৃত্বের শুরু
বিশ্ববিদ্যালয় আসাদকে শুধু একটি ডিগ্রি দেয়নি; দিয়েছে নিজের কথা বলার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার একটি প্ল্যাটফর্মও।
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইকোনমিকস স্টুডেন্টস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএসএসবি)-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সংগঠনটি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও পেশাগত উন্নয়নে কাজ করে।
এই দায়িত্বের মধ্য দিয়ে সংগঠন পরিচালনা, বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন, মানুষের সঙ্গে সমন্বয় এবং জনসম্মুখে কথা বলার সুযোগ পান আসাদ। দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে তিনি ইএসএসবি লিডারশিপ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডও পান।
তবে একই সময়ে তার সামনে খুলে যায় আরেকটি নতুন দরজা—গণমাধ্যম ও উপস্থাপনার জগৎ।
মাইক্রোফোনের সামনে ৫০টির বেশি অনুষ্ঠান
পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকার ও পডকাস্টভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ঢাকাচ্যাটের সঙ্গে যুক্ত হন আসাদ। সেখানে মাল্টিমিডিয়া পরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সাক্ষাৎকার, আলোচনা ও ওয়েবিনারে উপস্থাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইএসএসবি ও ঢাকাচ্যাটে কাজের সময় ৫০টির বেশি লাইভ অনুষ্ঠান ও টকশো পরিচালনা করেছেন আসাদ। এর মধ্যে ঢাকাচ্যাটের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘তারুণ্যের রাজনীতি’-তেও কাজ করেছেন তিনি। তরুণদের রাজনীতি ও জনপরিসরে অংশগ্রহণ ছিল অনুষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান বিষয়।
৫০টির বেশি লাইভ অনুষ্ঠান উপস্থাপনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাচ্যাটের পক্ষ থেকে তাকে সার্টিফিকেট অব অ্যাপ্রিসিয়েশন দেওয়া হয়।
যে তরুণ একসময় শ্রেণিকক্ষে ফিরতে চাইছিলেন না, কয়েক বছর পর তাকেই দেখা যায় ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকের সঙ্গে কথা বলতে। শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ার সেই সময়ের সঙ্গে এ সময়ের ব্যবধান তাই শুধু কয়েক বছরের নয়; এটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও একটি গল্প।
অর্থনীতি থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায়
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আসাদের পেশাজীবনে আরেকটি পরিবর্তন আসে। তিনি পিডিএস গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেস অ্যাপারেলস বাংলাদেশ লিমিটেডে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন।
এ দায়িত্বে নিয়োগ ও কর্মী অনবোর্ডিং, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, কর্মীদের নথি ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ সমন্বয়, তথ্য ব্যবস্থাপনা, প্রতিবেদন তৈরি এবং সাংগঠনিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার এ কাজটিও যেন একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি করেছে। অর্থনীতি তাকে শিখিয়েছে বিভিন্ন ব্যবস্থা ও কাঠামো বুঝতে। শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতৃত্ব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়েছে। আর গণমাধ্যমের কাজ তৈরি করেছে যোগাযোগের দক্ষতা। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে একটি পেশাগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।
এবার গন্তব্য দক্ষিণ কোরিয়া
এবার আসাদের গন্তব্য দক্ষিণ কোরিয়া। বুসানে কিয়ংসুং বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল বিজনেস বিষয়ে দ্বিতীয় মাস্টার্স করতে যাচ্ছেন তিনি।
আরেকটি মাস্টার্স করার সিদ্ধান্তকে শুধু নতুন একটি ডিগ্রি অর্জনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন না আসাদ। বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে জ্ঞান আরও গভীর করা এবং ভবিষ্যতে সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংগঠনিক উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোই তার লক্ষ্য।
অর্থনীতি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও ব্যবসা—ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলোকে এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগাতে চান তিনি।
তবে এতসব পেশাগত পরিচয়ের আড়ালেও থেকে গেছে সেই ছেলেটি, যে একসময় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।
একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছিল পথ
আসাদের গল্পের শক্তি হয়তো এখানেই। তার যাত্রা কোনো সুপরিকল্পিত ক্যারিয়ার রোডম্যাপ দিয়ে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তা দিয়ে।
একজন কিশোর স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। একজন বন্ধু তাকে আবার স্কুলে যাওয়ার জন্য ডাকল। সে ফিরে গেল। এরপর কারিগরি শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, মহামারীর কারণে বাধাগ্রস্ত শিক্ষাজীবন, মাছের বাজারে কাজ, শিক্ষার্থী সংগঠনে নেতৃত্ব, মাইক্রোফোন ও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো, পেশাজীবনে প্রবেশ—একটির পর একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে তার জীবনে।
এর কোনোটিই একা সাফল্যের নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু প্রতিবার থেমে যাওয়ার পর আবার শুরু করার সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে তাকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে।
ঢাকার মাটি ছেড়ে বুসানের পথে যাত্রার সময় আসাদের সঙ্গে ছিল ভর্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর বহু বছরের অভিজ্ঞতা। এর চেয়েও বড় করে ছিল একের পর এক পাওয়া দ্বিতীয় সুযোগের স্মৃতি।
যে বন্ধু একদিন শুধু স্কুলে যাওয়ার জন্য তাকে সঙ্গে ডেকেছিল, সেই আমন্ত্রণ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে তা হয়তো তখন কেউ জানত না। আসাদ নিজেও নয়।
আজ তার গন্তব্য দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু সেই যাত্রার শুরু আরও অনেক আগে—একটি শ্রেণিকক্ষে, যেখানে সে হয়তো আর কখনোই ফিরত না। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে আসাদ রহমানের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: শুরুটা অনিশ্চিত হলেই শেষটাও অনিশ্চিত হতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
