আতিয়া ইবনাত রিফাহ্: বাংলাদেশে ফেমিনিজম বা নারীবাদ নিয়ে আলোচনা হলেই নানা বিতর্ক সামনে আসে। অনেকের কাছে এটি পশ্চিম থেকে ধার করা একটি স্লোগান, আবার কারো কাছে এটি নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফেমিনিজম কেবল ব্যক্তিগত অধিকার নয়; বরং এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে ভাবার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্ন তোলে—আমাদের সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে গড়ে উঠছে এবং নারীর অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বর সেখানে কতটা দৃশ্যমান?
বাংলাদেশে “ফেমিনিজম” শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখে প্রথম ভেসে ওঠে কপালে বড় টিপ পরা একদল নারী, হাতে প্ল্যাকার্ড, স্লোগান তুলছে পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে। মিডিয়ার আলোয় বারবার ফুটে ওঠা এই চিত্র অনেকে মনে করেন নারীবাদ বা ফেমিনিজমের সারাংশ। অথচ ফেমিনিজম যদি কেবল পোশাক বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দাবিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে আসল সংগ্রাম আড়ালেই থেকে যায়। কারণ ফেমিনিজম আসলে কেবল ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের দাবি তোলে।
পশ্চিমা বিশ্বে ফেমিনিজম মূলত সমতার লড়াই থেকে শুরু হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, এবং পরে সমান বেতনের জন্য আন্দোলন করেছিল। জে. অ্যান থিকনার, যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রভাবশালী ফেমিনিস্ট স্কলার, দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা বোঝার ক্ষেত্রে নারীর অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘদিন অবহেলা করা হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি কেবল রাষ্ট্র ও যুদ্ধ দিয়ে বোঝা যায় না; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে নারীর জীবনযাপন, নিরাপত্তাহীনতা, আর অবদমিত কণ্ঠস্বর। থিকনার এর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নারী-পুরুষ উভয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া ছাড়া কোনো সমাজের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমাজে পশ্চিমা নারীবাদের এই কাঠামো হুবহু কার্যকর হয় না। কারণ আমাদের সমাজ গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক ইতিহাস, গ্রামীণ কাঠামো, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে। এই অভিজ্ঞতা পশ্চিমা নারীবাদের চেয়ে অনেক আলাদা। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Can the Subaltern Speak?” এ দেখিয়েছিলেন কীভাবে দক্ষিণের প্রান্তিক নারীকে পশ্চিমা চিন্তায় কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে আঁকা হয়। কিন্তু সেই নারীর নিজের কণ্ঠস্বর কোথায়? তাকে শোনার জায়গা তৈরি হয় না। একইভাবে চন্দ্রা মোহান্তি সমালোচনা করেছেন যে পশ্চিমা গবেষকরা প্রায়ই তৃতীয় বিশ্বের নারীকে একধরনের একরঙা ছবি হিসেবে উপস্থাপন করেন— অসহায়, বঞ্চিত, নির্যাতিত। অথচ বাস্তবে বাংলাদেশের নারী একদিকে গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক, অন্যদিকে সংসারের চালিকা শক্তি; একদিকে বাল্যবিবাহের শিকার, অন্যদিকে গ্রামের কৃষি জমিতে অদৃশ্য শ্রমের বাহক। এই জটিল বাস্তবতা পশ্চিমা নারীবাদের চোখে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
তাই পোস্ট-কলোনিয়াল ফেমিনিজম বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। মারিয়া লুগোনেস দেখিয়েছেন কীভাবে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকায় নারীর অভিজ্ঞতা পশ্চিমাদের থেকে ভিন্নতর। তিনি যুক্তি দেন, নারীবাদকে বুঝতে হলে স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, পরিবারব্যবস্থা, ধর্মীয় প্রভাব সব মিলিয়ে দেখতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই। আমাদের জন্য প্রকৃত ফেমিনিজম মানে হবে নিজের সমাজের সমস্যাগুলো থেকে নারীর গল্প বলা, বাইরের ধার করা কোনো থিওরি থেকে নয়।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসও আমাদের এই শিক্ষা দেয়। বেগম রোকেয়া শত বছর আগেই লিখেছিলেন, নারীর শিক্ষা ছাড়া জাতির মুক্তি অসম্ভব। জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম নারীর স্বাধীনতার পক্ষে কলম ধরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামীণ নারীরা অস্ত্র ধরেছেন, শরণার্থী শিবিরে লড়েছেন, আবার একইসাথে সহিংসতার ভয়াবহ শিকার হয়েছেন। এই ইতিহাস আমাদের দেখায় নারীবাদ মানে শুধু শহরের এলিট নারীর পোশাকের স্বাধীনতা নয়, বরং পুরো জাতির মুক্তির সাথে জড়িত এক গভীর সংগ্রাম।
আজকের বাংলাদেশে নারীরা একদিকে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক নারী। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। নারীরা বিদেশ থেকে গৃহশ্রমিক হিসেবে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অবদান রাখছেন। কিন্তু একই সাথে তারা ভুক্তভোগী। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অনিরাপদ পরিবেশ এখনও রয়ে গেছে। অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাদের সামাজিক মর্যাদা সেই অনুযায়ী বাড়ছে না।
পশ্চিমা ফেমিনিজমের ভাষা সমতার (equality) কথা বলে। কিন্তু আমাদের দেশে দরকার সমতার পাশাপাশি ন্যায্য সহায়তা (equity)। উদাহরণস্বরূপ, একজন মা যদি সংসার সামলে অফিসে কাজ করেন, তবে শুধু সমান সুযোগ দিলেই হবে না; তার জন্য বিশেষ সহায়তা যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুর যত্নের ব্যবস্থা, এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত ফেমিনিজম নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করায় না; বরং নারী ও পুরুষকে একসাথে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের সহযাত্রী হিসেবে দেখে।
বাংলাদেশে আজ নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ক্যাম্পাসে, কর্মক্ষেত্রে নারীর সমতা ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু সেই আলোচনাকে বাস্তব জীবনে নামাতে হবে। নারীর নিরাপত্তা রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে সমান বেতন, গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্যসেবা এসব না হলে নারীবাদ কেবল স্লোগানেই থেকে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য একমাত্র কার্যকর নারীবাদ হলো পোস্ট-কলোনিয়াল ফেমিনিজম। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় আমাদের নারীর গল্প আমাদেরই বলতে হবে, আমাদের মাটি থেকে, আমাদের ইতিহাস থেকে। পশ্চিমা আখ্যানের ভেতর ঢুকে নিজেদের হারিয়ে ফেলা নয়, বরং নিজেদের সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও কণ্ঠস্বর দিয়ে গড়া এক নতুন নারীবাদ দরকার যা হবে প্রকৃত “বাংলাদেশি ফেমিনিজম।”
*লেখক: গবেষক, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
