ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর আসছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ৩–৪ মাস অপেক্ষা না করেই এখন দ্রুত ইনভয়েস পেমেন্ট পাওয়া সম্ভব হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক খুব শিগগিরই বৈশ্বিক ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের অনুমতি দেবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে রপ্তানিকারকরা বিদেশি ক্রেতা-স্বীকৃত ইনভয়েস আপলোড করতে পারবেন। ক্রেতার ঋণযোগ্যতা যাচাইয়ের পর বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ইনভয়েসগুলো কেনার জন্য দর দেবে। ফলে রপ্তানিকারকরা ইনভয়েসের প্রকৃত অর্থের চেয়ে কিছুটা কম অগ্রিম অর্থ পেতে পারবেন, অপেক্ষার সময় না কাটিয়েই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সার্কুলার জারির সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। “সর্বোচ্চ ডিসকাউন্ট রেট নির্ধারণ করা হবে সোফর+৪ (প্রায় ৮%), যাতে কোনো রপ্তানিকারককে অতিরিক্ত ডিসকাউন্টে বিল নগদায়ন করতে না হয়,” বলেন তিনি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের ট্রেড ফাইন্যান্স ব্যবস্থায় “একটি যুগান্তকারী ফ্যাসিলিটেশন মেজার” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি রপ্তানিকারকদের জন্য স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে, তবে কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।”
ডিসকাউন্টিং প্ল্যাটফর্মের কার্যপ্রণালী
রপ্তানিকারক পণ্য পাঠানোর পর আমদানিকারকের ইস্যু করা ইনভয়েস অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আপলোড করেন। এরপর ক্রেতার ক্রেডিট রেটিং যাচাই করে ব্যাংক বা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভয়েসের বিপরীতে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়। ইনভয়েসের প্রকৃত অর্থের চেয়ে কিছু কম অগ্রিম অর্থ রপ্তানিকারক পান—যেমন ১ লাখ ডলারের ইনভয়েসে ৯৭ হাজার ডলার।
বিশ্বব্যাপী সক্রিয় ডিসকাউন্টিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কো পোলো নেটওয়ার্ক (জার্মানি), কমগো (সুইজারল্যান্ড), কনটোর (সিঙ্গাপুর), ট্রেড লেন্স (যুক্তরাষ্ট্র), এবং উই.ট্রেড (ইইউ)।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট
বর্তমানে বাংলাদেশে সীমিত আকারে এইচএসবিসি ও প্রাইম ব্যাংক ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং সুবিধা দিচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় ৪৮.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বড় অংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, “ব্যাংকগুলো সাধারণত প্রি-শিপমেন্ট ও ব্যাক-টু-ব্যাক ফাইন্যান্স করে। কিন্তু পোস্ট-শিপমেন্ট অর্থায়ন এখনো সীমিত। এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলে রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।”
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “ডেফার্ড পেমেন্ট এখন ১০৫ দিন পর্যন্ত গড়ায়। অথচ রপ্তানিকারককে আগেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে হয়। ইনভয়েস ডিসকাউন্টিং এখন সময়ের দাবি।”
বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, “ব্যাংকগুলো অনেক সময় রপ্তানি বিলের বিপরীতে ঋণ দিতে চায় না। এই প্ল্যাটফর্ম রপ্তানিকারকদের দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা পেতে সহায়তা করবে।”
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। আমেরিকান ও ইউরোপীয় ক্রেতারা সাধারণত ৩০–৯০ দিন পরে অর্থ পরিশোধ করেন। ডিসকাউন্টিং সুবিধা থাকলে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী বলেন, “এই উদ্যোগে রপ্তানিকারকদের জন্য বৈশ্বিক মার্কেটে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে, তবে মনিটরিং ও নীতিগত দিক শক্তিশালী হতে হবে।”
