ডেস্ক রিপোর্ট: সরকারি হাসপাতাল মানেই অতিরিক্ত ভিড়, এক শয্যায় একাধিক রোগী কিংবা মেঝেতে চিকিৎসার দৃশ্য—এই চিরচেনা বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ। ‘এক শয্যায় এক রোগী’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি আধুনিক মডুলার অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে সংক্রমণমুক্ত অস্ত্রোপচারের নজির স্থাপন করেছে বিভাগটি। এর ফলে হাসপাতাল-সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, অর্থোপেডিক ওয়ার্ডগুলো পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল। নির্ধারিত সময় ছাড়া রোগীর স্বজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা নিয়মিত মাইকে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং পুরো বিভাগটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে।জানা গেছে, ২০২৫ সালের শুরুতে অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম আকনের উদ্যোগে বিভাগটিতে প্রথমবারের মতো আধুনিক মডুলার অপারেশন থিয়েটার চালু হয়।
উন্নত বায়ু পরিশোধন ব্যবস্থা ও পজিটিভ প্রেসার প্রযুক্তি সংবলিত এই ওটি অত্যন্ত নিরাপদ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এখানে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি বড় ও জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলেও একটিতেও পরবর্তী সংক্রমণের ঘটনা ঘটেনি। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সরকারি হাসপাতালের এমন সাফল্য জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।ঢামেক অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন বাসসকে জানান, বিভাগটির সব কার্যক্রম এখন প্রায় পুরোপুরি ডিজিটাল।
রোগী ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সম্মতিপত্র ও চিকিৎসা পরিকল্পনা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নিজস্ব উচ্চক্ষমতার সার্ভার ও ১০০ এমবিপিএস ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া দ্রুত ও নির্ভুল হয়েছে, যা রোগীর ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়েছে।তিনি বলেন, চিকিৎসা শিক্ষাতেও আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। মডুলার ওটির সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি লাইভ অস্ত্রোপচার দেখতে পারছেন। অনলাইনে যুক্ত হচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও।
এর মাধ্যমে বিভাগটি আন্তর্জাতিক মানের একটি শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে।রোগীদের দোরগোড়ায় বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দিতে স্পাইন কেয়ার, পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিকস ও স্পোর্টস মেডিসিন ক্লিনিক চালু রয়েছে। ভবিষ্যতে হ্যান্ড সার্জারি, ইলিজারভ ও ডিফরমিটি কারেকশন এবং অর্থোপেডিক অনকোলজির মতো সুপার-স্পেশালিটি সেবা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এতে সাধারণ রোগীদের বিদেশমুখী বা ব্যয়বহুল চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা কমবে।
অধ্যাপক জাকির হোসেন জানান, হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের নার্সদের পেশাদার সেবার জন্য প্রশংসা ও সম্মাননা দিয়েছেন। নার্স ও ব্রাদারদের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও অর্থোপেডিক নার্সিং বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৬৩ বছরে পদার্পণ করা এই বিভাগ প্রমাণ করেছে—সরকারি হাসপাতালেও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব। এটি রোগীদের জন্য আশার আলো এবং জাতির জন্য গর্বের।
বিভাগটির ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৬৩ সালে প্রয়াত অধ্যাপক ড. ওমর আহমেদ জামালের হাত ধরে ঢামেকে আধুনিক অর্থোপেডিক চিকিৎসার যাত্রা শুরু হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বিভাগ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়ও দেশের সবচেয়ে বড় ট্রমা সেন্টার হিসেবে গুরুতর আহতদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিভাগটি।পুরুষ ওয়ার্ডের ইনচার্জ রেজওয়ানা পারভীন বাসসকে জানান, ‘এক শয্যায় এক রোগী’ নীতি কার্যকর হওয়ায় রোগীদের সেবা দেওয়া সহজ হয়েছে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় নেই।
রোগীদের জন্য রঙভিত্তিক বিছানার চাদর ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়েছে।ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী জিয়াউদ্দিন বলেন, আগে ঢামেকে চিকিৎসা নিলেও এমন পরিবেশ দেখেননি। চিকিৎসকরা নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন, ওয়ার্ড পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। সরকারি হাসপাতালে এমন পরিবর্তন সত্যিই প্রশংসনীয়।
