আতিয়া ইবনাত রিফাহ্: জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়; এটি বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা। পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলে এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, ঝড়, খাদ্য সংকট; এই সংকটগুলো বিভিন্নভাবে মানবজীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। শিল্পবিপ্লবের পর মানবসভ্যতার উৎপাদন ও ভোগের ধারা পৃথিবীর তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৩ ডিগ্রি বেশি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে কোনো এক বছর এ তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশেরও বেশি।
এই পরিবর্তনের প্রভাব সব রাষ্ট্রের উপর সমান নয়। এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে কম দায়ী হয়েও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে আন্তর্জাতিক বিতর্ক; কারা দায়ী, কারা ক্ষতির বোঝা বহন করবে এবং কারা অর্থায়ন করবে। জলবায়ু রাজনীতি তাই শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক প্রশ্নও।
পরিবেশগত ঝুঁকির বিস্তৃতি: সংকটের বহুমাত্রিক চিত্র
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ এখন মানুষের জীবনযাপন, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও অভিবাসন সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। গত এক বছরে বিশ্বের প্রায় চার বিলিয়ন মানুষ অন্তত ৩০ দিন চরম উত্তাপে জীবন কাটিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বহু অঞ্চল এখন প্রতিবছর তীব্র তাপপ্রবাহের সম্মুখিন হয়। দিল্লি ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ২০২৪ সালে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছায়। জলবায়ুর অস্থিতিশীলতা যে কোনো একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয় তার সবথেকে বড় প্রমাণ হলো, একই সময়ে ইউরোপে বন্যা আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়াবহ দাবানল
জলবায়ুর এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে কৃষি। মৌসুমি বৃষ্টির সময় বদলে যাচ্ছে, ফসলের সময়কাল কমছে, উপকূলীয় জমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে; যার ফলে এ জমি চাষযোগ্যতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিনির্ভর জীবিকা এতে গভীরভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া নতুন নতুন রোগের বিস্তার কৃষিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ছে ভয়াবহ প্রভাব। ক্লাইমেট সেন্ট্রাল ও টাইম-এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর এখন তাপমাত্রা ও অম্লতার চাপে ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিলুপ্ত হলে উপকূলীয় সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সামুদ্রিক সম্পদ কমে যাবে।
মানুষের স্বাস্থ্যও এ প্রভাবমুক্ত নয়। চরম তাপপ্রবাহে ডিহাইড্রেশন, শ্বাসকষ্ট, এবং হৃদরোগের মতো রোগ বাড়ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার এমন সব অঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে আগে এগুলোর উপস্থিতি ছিল না। WHO জানিয়েছে, গত দশ বছরে জলবায়ুজনিত রোগ ৩২ শতাংশ বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে শহরমুখী অভিবাসনও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাসস্থান হারাচ্ছে।
উত্তর–দক্ষিণ বৈষম্য: দায়, নৈতিকতা ও অর্থায়ন সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হলো উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন। উন্নত দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী শিল্পায়নের সুবিধা ভোগ করেছে; আর শিল্পায়নের প্রভাবে সৃষ্ট নির্গমনের ক্ষতি আজ বহন করছে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো। এখান থেকেই এসেছে আন্তর্জাতিক নীতি “কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটিস”: দায় সবার, কিন্তু দায়ের মাত্রা এক নয়।
২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলনে ধনী দেশগুলো প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। কিন্তু তাদের দেওয়া এই অর্থের বড় অংশই ঋণ। ফলে দরিদ্র দেশগুলো আরও ঋণচাপে ডুবে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের ঘোষণা এলেও কাঠামো ও বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। উন্নত দেশগুলো আইনি দায় তৈরি হওয়ার ভয়ে ক্ষতিপূরণের ভাষা ব্যবহারেও অনীহা দেখাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাব বলছে, বর্তমান নীতি অপরিবর্তিত থাকলে শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি ছুঁতে পারে। অর্থাৎ প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য আজ প্রায় অপ্রাপ্তিযোগ্য হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা: স্থিতিস্থাপকতার নতুন পথ
উত্তর-দক্ষিণ সহযোগিতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন জোট গড়ে তুলতে শুরু করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগের পূর্বাভাস; এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ব্রাজিল, কেনিয়া, ভুটান, নেপালসহ বহু দেশ অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। যদিও কখনো কখনো বড় শক্তিগুলোর বিনিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবুও পরস্পরিক এ সহযোগিতা গ্লোবাল সাউথকে অভিযোজন ও উদ্ভাবনের নতুন সম্ভাবনা দিচ্ছে।
সিদ্ধান্তের সময় এখনই
জলবায়ু পরিবর্তন এখন মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলো এখনো ঐতিহাসিক দায় পূরণে পিছিয়ে রয়েছে, আর উন্নয়নশীল দেশগুলো সীমিত সম্পদ নিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন সাহসী নীতি, ন্যায্য অর্থায়ন এবং উত্তর-দক্ষিণ-দক্ষিণ উভয় ধরনের সহযোগিতা। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশ বা অর্থনীতির বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ন্যায়, মানবাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপান্তরিত। এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, কারণ এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ এবং প্রচেষ্টা জরুরি।
*লেখক: গবেষক ও শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
