প্রতীকী ছবি
মোঃ সোহান রানা: একটি দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন হবে এটা মূলত নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। কেননা শিক্ষা একটি দেশের শাসক ও নাগরিক তৈরির পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। আর আজ সেই শিক্ষা ব্যবস্থা দলীয়করণ তথা রাজনীতির প্রভাবে গভীর সংকটের মুখোমুখি। রাজনৈতিক স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে অনিয়ম ও সুশাসনের অভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে সুষ্ঠু একাডেমিক পরিবেশ।
যদিও রাজনীতিকরনের ইতিহাস বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে শিক্ষাঙ্গনে এবং শিক্ষার সরকারি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় রাজনীতিকরণের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তেই থাকে কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ও সবকিছু দলীয়করণের প্রপভাবে তা পরিণত হয়েছে সরকারি দলের লাঠিয়াল কলোনিতে। দুঃখজক হলেও সত্য যে, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক পর্যন্ত রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের নামে রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি প্রভাব রয়েছে,যা ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ফলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ শিক্ষা থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতে নিবদ্ধ হয়।
আমাদের দেশে মন্ত্রী পরিষদের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা কাঠামোর পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এছাড়াও সরকার পরিবর্তন হলে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশুনায় ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক প্রভাব শুধু পাঠ্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নেই বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায়ও এর প্রভাব সুস্পষ্ট।
শিক্ষা ব্যবস্থা দলীয়করণ ও শিক্ষকদের ভূমিকা
বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে প্রায়শই মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেশের উচ্চ বিদ্যাপিঠ গুলোতেও যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিক অনুগত্য ও পরিচয় অনেক সময় নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় অদক্ষ ও অযোগ্য লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ পদে অসিন হয় যা শিক্ষার গুণগতমানকে ব্যাহত করে। শিক্ষকদেরকে নানাভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্তকরণ শিক্ষাব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এক অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আবার দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করায় শিক্ষকরা পড়ানো ও গবেষণার পরিবর্তে নিজ নিজ দলের তাঁবেদারিতে অধিক সময় ব্যায় করে থাকেন। যেমন: বিগত কয়েক দশকে দেখা গিয়েছে শিক্ষকদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে তাদের পেশাগত উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, পদোন্নতি, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা শিক্ষার মানকেই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও করে তুলেছে অকার্যকর ও দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। শিক্ষকরা যখন কোন রাজনৈতিক দলের স্বার্থের প্রতি অনুগত হয়ে কাজ করেন, তখন তারা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করার চেয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে কাজ করাকে বেশি প্রাধান্য দেন। ফলে একাডেমিক বা পেশাগত জীবনে যেমন তাদের কোন উন্নতি হয়না, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও তারা কোন অবদান রাখতে সক্ষম হয়না।
যখন শিক্ষা ব্যবস্থা দলীয়করণ প্রক্রিয়ার ফলে শিক্ষা খাতে নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাব অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন দেখা যায় শিক্ষানীতিমালা প্রনয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ ওতপ্রতভাবে জড়িত হয়ে পড়ে। তাই দেখা গিয়েছে বিগত সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোন বিচার বিবেচনা ছাড়াই শিক্ষা খাতে নীতিমালা পরিবর্তন হয়েছে। এগুলোর ফলে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে।
রাজনৈতিক প্রভাব উত্তরণে করনীয়
আমরা যদি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা চিন্তা করি সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা বিগত সময়ে দেখেছি সরকার তার উন্নয়নকে প্রসারিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল কিন্তু রাজনৈতিক কারণেই এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব হয়নি। উদ্যোগগুলো বিনষ্ট হওয়ার পিছনে রাজনীতি দায়ী। জুলাই বিপ্লব আমাদেরকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখালেও বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এখনো দেখা যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অতিমাত্রায় রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রচন্ডভাবে ব্যাহত করছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধানে কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে: শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বদলীয় সমঝোতাকে গুরুত্বারপর করা। শিক্ষানীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত যাতে তা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।
শিক্ষানীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে যাতে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষানীতিও পরিবর্তন না হয়ে যায়। শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। এই বোর্ডে শিক্ষাবিদ, এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের দ্বায়িত্ব হবে শিক্ষার মানোন্নয়ন, পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষক নিয়োগের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহায়তা করা।
*লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন: ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের অবস্থান
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল
