নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতিতে চলতি বছর নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে প্রায় ৩ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা, সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এখনও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে বজায় রেখেছে। এর ফলে ঋণের খরচ বেড়ে গেছে, ব্যবসা ও বিনিয়োগ কমে আসছে। চীনের প্রবৃদ্ধি কমে আসায় বিশ্ববাজারে চাহিদা দুর্বল হচ্ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
শুধু তাই নয়, প্রযুক্তি খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসার শিল্পোৎপাদন ও শ্রমবাজারকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অনেক দেশে এআই-এর কারণে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, তবে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি খাতে রূপান্তরও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো ব্যয়ের চাপে পড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বৈশ্বিক এই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে। সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ অনুভব করছে। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছে, এ ধরনের শুল্ক আরোপ হলে পোশাক রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাজেটের অর্ধেকের কিছুটা কম খরচ হয়েছে। অবকাঠামো ও শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণের বোঝা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বহিঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগ পরিবেশকে নড়বড়ে করছে। বিদ্যুৎ সংকট, পরিবহন অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি উৎপাদন খাতকে প্রভাবিত করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো—ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং কিছু রপ্তানি বাজারে সাফল্য বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, বাজেট বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদনশীল খাতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে এবং রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছ নীতি বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হবে।
সর্বোপরি, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলেই কেবল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই রাখা সম্ভব হবে।
