আতিয়া ইবনাত রিফাহ্
প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আর নিরাপদে ফেরে না। অসংখ্য প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে সড়কে, আর আমরা প্রতিবারই শুধুমাত্র অশ্রু ঝরিয়ে থেমে যাই। পরিকল্পনার ঘাটতি, আইনের শিথিলতা ও নৈতিকতার অবক্ষয়—সব মিলিয়ে এই ট্র্যাজেডি যেন পরিণত হয়েছে এক স্থায়ী রক্তনদীতে।
বাংলাদেশের সড়কগুলো প্রতিদিনই যেন হয়ে ওঠে এক রক্তাক্ত উপাখ্যান। প্রতিটি সকাল যেমন নতুন সূর্য নিয়ে আসে, তেমনি নিয়ে আসে নতুন নতুন মৃত্যুর সংবাদ। গণপরিবহনের বেহাল দশা, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইনের প্রয়োগহীনতা—এই সব একসঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছে এক নিরব সন্ত্রাস। এটি এখন আর কেবল দুর্ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে, যা কেবল মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে ৩৭০০টিরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৪০০০ মানুষ। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। নিহতদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই ছিলেন মোটরসাইকেল আরোহী এবং ২২ শতাংশ ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ। পরিসংখ্যান বলছে সংখ্যার কথা, কিন্তু বাস্তবতা হলো—এ সংখ্যা প্রতিটিই একেকটি পরিবারকে চিরতরে শোকাহত করেছে, কেড়ে নিয়েছে কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে।
দুর্ঘটনার পেছনের দায় কার?
চালকদের অদক্ষতা ও লাইসেন্স প্রদানের অনিয়ম রয়েছে এই সমস্যার কেন্দ্রে। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার চালক ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স সংগ্রহ করে, এমন তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। তারা সড়কে নেমে যানবাহন চালাচ্ছেন বিনা প্রশিক্ষণে, আর সাধারণ মানুষ দুঃসহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অপরদিকে সড়কে চলছে অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল। বর্তমানে অনুমোদনহীন প্রায় সাত লক্ষ ইজিবাইক চলছে দেশের বিভিন্ন রাস্তায়। একই সঙ্গে চার লক্ষেরও বেশি গাড়ির নেই ফিটনেস, অথচ তারা দিব্যি যাত্রী বহন করে চলেছে—বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায়।
এর পাশাপাশি রয়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাহীন দুর্বলতা। ঢাকার অধিকাংশ সিগনাল এখনো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রিত, যা প্রযুক্তির এই যুগে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ২০২৪ সালে চালু হওয়া ‘স্মার্ট ট্রাফিক’ পাইলট প্রকল্প এখনও বিস্তৃত হয়নি, ফলে যানজট ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটছে না।
ঈদ এলে বাড়ে লাশের সারি
প্রতিটি ঈদ যেন হয়ে ওঠে একেকটি মৃত্যুযাত্রা। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে ঘটেছে ১৩৬টি দুর্ঘটনা, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৪ জন। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ, চালকদের বিশ্রামহীন ডিউটি, পরিবহনের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণহীন ট্রাফিক পরিস্থিতি এই সময়ে দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণ করে তোলে। মৃতদের প্রায় ২১ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল আরোহী, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বিপদে ফেলছে মারাত্মকভাবে।
একটি দুর্ঘটনা মানেই একটি পরিবার ধ্বংস
সড়ক দুর্ঘটনা মানেই কেবল মৃত্যু নয়—এটি একেকটি পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক ধস। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু পরিবারের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগের নামান্তর।
যুবসমাজের সম্ভাবনা থেমে যাচ্ছে সড়কে
২০২৫ সালের মে মাসে সিলেটের তামাবিল রোডে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন সদস্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী। এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে। এভাবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে।
আন্দোলনের প্রতিধ্বনি, কিন্তু বাস্তবায়নে ভাটা
২০১৮ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সড়কের নৈরাজ্য কতটা ভয়াবহ। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পাশ হওয়ার পর কিছুটা আশার আলো দেখা গেলেও বাস্তবায়নে এসেছে স্থবিরতা। আইনটির প্রায় ৭০ শতাংশ ধারা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ, চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।
নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙবে কবে?
সরকার মাঝেমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক করে, কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়, গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়—কিন্তু মাঠে কার্যকর পরিবর্তনের ঘাটতি থেকেই যায়। অনেক চালক ও পরিবহন মালিক রাজনৈতিক সুরক্ষায় থেকে যান, ফলে দায়বদ্ধতা তো দূরের কথা, তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যার ঘাটতি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ একে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে।
কী হতে পারে এই মৃত্যু মিছিল বন্ধের উপায়?
এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। সর্বাগ্রে চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন ও অনুমোদনহীন যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে, এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া দূর করতে হবে কঠোরভাবে।
স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ ও মোবাইল কোর্টের নিয়মিত অভিযান আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। যত্রতত্র ওভারটেকিং ও স্পিডিংয়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং চালকের রেকর্ডে যুক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শিশু ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। একইসাথে গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো উচিত—কেবল দুর্ঘটনার খবর প্রচার নয়, বিশ্লেষণভিত্তিক রিপোর্টিং করতে হবে, যাতে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারে।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের জন্য এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়, এটি হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর দৈনন্দিনতা। প্রতিদিন যারা রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছেন, তারা কেবল একেকটি নাম বা সংখ্যা নয়—তারা আমাদের সমাজেরই অংশ, আমাদেরই প্রিয়জন। প্রশাসনের উদাসীনতা, আমাদের নীরবতা, এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা একত্রে এই রক্তাক্ত অবস্থার জন্য দায়ী। এখনই সময়—প্রতিবাদের চেয়ে কার্যকর পরিবর্তনের দিকে যাওয়ার, কারণ প্রতিদিনের এই মর্মান্তিক মৃত্যু-মিছিল থামাতে না পারলে কাল আমাদের মধ্যেই কেউ একজন হবে সেই ‘পরবর্তী শোকবার্তা’।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
