ডেস্ক রিপোর্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)। মাত্র এক বছর আগে যাদের নেতৃত্বে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল, সেই তরুণ নেতৃত্বের অনেকেই এবার ভোটে আশানুরূপ ফল পাননি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেন এত অল্প সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল ধারার নেতৃত্ব এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়ল?
শুধু বাগছাসই নয়, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠনও একইভাবে ভোটে বড় ধাক্কা খেয়েছে। – বিবিসি নিউজ
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সবচেয়ে সরব ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। অনেকের ধারণা ছিল, ডাকসু ও জাকসুসহ বিভিন্ন নির্বাচনে তারা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে। এনসিপিও ভেবেছিল, এই জয়ের ধারাবাহিকতা তাদের নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু ফল উল্টো হওয়ায় এখন নতুন করে ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে।
ভাঙন ও সাংগঠনিক দুর্বলতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে বাগছাস তিনটি আলাদা প্যানেলে বিভক্ত হয়ে যায়। পরে সমঝোতার চেষ্টা হলেও তাতে কাজ হয়নি। ফলাফলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় সংসদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদেই তারা জয়ী হতে পারেনি। জাহাঙ্গীরনগরে যদিও দু’টি ছোট পদ পেয়েছে, সামগ্রিকভাবে ফলাফল হতাশাজনক।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, প্রস্তুতির ঘাটতি ও দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর কারণেই তারা প্রত্যাশিত সাফল্য আনতে পারেনি। একইসঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন এনসিপি নেতারা।
সমালোচনা ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এনসিপিকে অনেকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে দেখছে। আর শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্ট্যাবলিশমেন্টের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। সেটিই বাগছাসের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপি-সমর্থিত ছাত্রদলেরও চরম ভরাডুবি হয়েছে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পদেই জয়ী হতে পারেনি তারা। জাহাঙ্গীরনগরে ভোটগ্রহণ চলাকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তারা শেষদিকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।
ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, কেন এমন ব্যর্থতা হলো তা মূল্যায়নের চেষ্টা চলছে। তাদের ধারণা, শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করেছিল—ছাত্রদল জিতলে আবার পুরনো ধরনের দলীয় রাজনীতি ফিরে আসতে পারে।
বাম সংগঠনের হতাশা
প্রগতিশীল ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও এ নির্বাচনে বড় কোনো সাফল্য পায়নি। একসময় যাদের হাত ধরে ডাকসু-জাকসুতে বহু নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল, এবার তাদের ফলাফলও ছিল আশানুরূপ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ জানান, তারা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান না করলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ আছে। জাহাঙ্গীরনগরে যে বিশৃঙ্খলা হয়েছে সেটিও তাদের পরাজয়ের একটি কারণ।
অপ্রত্যাশিত বিজয়
ডাকসুর নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিধস জয় অন্যদের হতাশাকে আরও গভীর করেছে। বাম সংগঠনগুলো মনে করছে, আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা কমিটিতে শিবিরপন্থীরা সক্রিয় ছিল, সেটির সুযোগ নিয়েই তারা এবার জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।
ফলাফলের পর এখন সবাই নিজেদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে ব্যস্ত। বাগছাস ও এনসিপির ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে, ছাত্রদল মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নেমেছে, আর বাম সংগঠনগুলোও ফলাফলকে সহজভাবে নিতে পারছে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ডাকসু ও জাকসুর এই নির্বাচনে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ নতুনভাবে ভাবাচ্ছে সবাইকে।
