তানজিনা নওশিন, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র: মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লক্ষ নাকি ৩ লক্ষ – সেই বিতর্কে আজ যাবো না। তবে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসর দেশীয় আলবদর আর রাজাকার বাহিনীর ক্ষমা বাংলাদেশের মাটিতে কোনোদিনই হবে না।
আমার বাবার মুখে যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় তার আর তার অনেক বন্ধু/ভাইদের রুদ্ধশ্বাস কষ্ট আর আত্মত্যাগের গল্প শুনতাম, তখন নিজের অজান্তেই দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কিভাবে তিনি আর তার বন্ধুরা বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন, কিভাবে তার অনেক কাছের বন্ধুকে হারিয়েছেন – সেসব ইতিহাস যখন বলতেন, নিজের ভিতরে একজন মুক্তিযোদ্ধা কে অনুভব করতাম।
বাংলাদেশ কে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বানাতে মুক্তিযোদ্ধা আর বীরাঙ্গনাদের ঋন, কোনোদিনও এ প্রজন্ম শোধ করতে পারবে না। তবে ইতিহাস বিকৃতির মতো ক্রাইম যারা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের বুকে করে গেছে, তাদেরকে ইতিহাসই প্রত্যাখান করবে – এটাই বাস্তবতা, এটাই ইতিহাসের নিয়ম।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাংলাদেশে এদেশের জনগনের অধিকার রক্ষায় শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সেসময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রধানতম নেতা তিনিই ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পক্ষে যে দুচারজন শীর্ষস্থানীয় নেতা কন্ঠ তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। তবে তিনি কোনো নবী-রাসুল ছিলেন না।
কাজেই বহু ভূলভ্রান্তি তিনিও করেছেন।
নেতৃত্বের ত্রুটি নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে দেশে দেশে এমন অনেক নেতাই ভুল করেছেন। ভুল মানুষই করে, ফেরেশতাদের হিসাব ভিন্ন।
নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয়ের পর, তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, এতে আমি দোষের কিছু দেখি না, তার জায়গায় আপনি-আমি বা, অন্য কোনো নেতা থাকলে – এমনটাই করতে চাইতো।
২৫ শে মার্চে তার আত্মসমর্পন বা গ্রেপ্তার হওয়াটা হয়তো তার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং – এটি বিশাল একটি ভুল ছিলো।
উনার সেসময়কার পলিটিক্যাল প্রেডিকশন ছিলো ভুল।
আর তার এই আত্নসমর্পনই নির্দেশ করে- তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়ে, অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেই অধিক আগ্রহী ছিলেন।
উনি ২৫ মার্চ পরবর্তী ৯ মাসের পাকিস্তানি জান্তা সরকারের গনহত্যা আর অবর্ননীয় অত্যাচারের বিষয়টা হয়তো আগাম আঁচ করতে পারেননি। ভেবেছিলেন উনি গ্রেফতার হলে, পূর্ব পাকিস্তানে বড়সড় আন্দোলন হবে, ফরেন প্রেশার গ্রুপ পশ্চিমাদের চাপ দিবেন; তারই ফলশ্রুতিতে উনি উনার ফেয়ারলি ডিজার্ভড প্রাইম মিনিস্টারশিপ পাবেন।
২৫ শে মার্চে উনি আত্মসমপর্ণ না করলে, এবং পাকিস্তানিদের অপ্রেসিভ একশন স্বচক্ষে দেখলে, নি:সন্দেহে এক্টিভলি স্বাধীনতা যুদ্ধ অর্গানাইজ করতেন। এবং এ কাজটির জন্য অন্ততঃ ঐসময়ে তার কোনো বিকল্প ছিলোও না।
জহির রায়হানের “সময়ের প্রয়োজনে” প্রবন্ধটি পড়ে যতটুকু বুঝেছি মানুষ যা কিছু করে, সবই সময়ের প্রয়োজনে। যেকারনে উনার অনুপস্থিতিতে, জাতির চরম দুর্যোগপূর্ন পরিস্থিতিতে, শীর্ষ নেতৃত্বের সিরিয়াস ভ্যকুয়াম স্টেটেও; এক্কেবারে আনপপুলার বেশ ক’জন মানুষ ফ্রন্ট লাইনে চলে আসে, যাদের ২৬ শে মার্চের আগে তেমন কেউই চিনতো না। বাট দে টুক দ্যা রাইট ডিসিশন অন রাইট টাইম।
জিয়াউর রহমান, এম এ জি ওসমানী এবং আরও অনেকে প্লেইড সাম সিরিয়াস ইনডিসপেনসেবল রোলস ডিউরিং দ্যাট টাইম।
নিজেদের পরিবার পাকিস্তানিদের জিম্মায় থাকবার পরও, তাদের সিকিউরিটির চিন্তা না করে, তারা বলে উঠেছিলেন “উই রিভল্ট”।
কোনো কারনে যদি দেশ স্বাধীন না হতো – এসব সেনাসদস্যদের পরিনতি কি হতো? নিশ্চিত কোর্ট মার্শাল। অথচ ইতিহাসের পাতা থেকে এইদুইজন সহ আরো অনেক লিডিং প্লেয়ার দের এক্সিটেন্স একরকম বিলীন হবার উপক্রম হয়েছিল বিগত কয়েক বছরে।
অথচ এনারা দুজন সহ আরো বেশ কিছু কম্পিটেন্ট সেনা সদস্য এবং সিভিলিয়ান ফ্রিডম ফাইটার পুরো স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং স্বশরীরে যুদ্ধ করেছেন।
অন্যদিকে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী বহু পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট পুরো যুদ্ধের সময়টা আরাম আয়েশের জীবন কাটিয়েছে ভারতে – একথা আমাদের কারোরই অজানা নয়।
অফকোর্স স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে শেখ মুজিবুর রহমানের অন বিহাফে, অফকোর্স পুরো ৯ মাসের যুদ্ধে সাধারন জনগণ এবং যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার নাম ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান;
ডিসপাইট অফ হিস ফিজিক্যাল এবসেন্স এন্ড দ্যা ল্যাক অফ ক্লিয়ার কল ফর লিবারেশন ওয়ার। এন্ড মোস্ট ইমপরটেন্টলি উইথ কম্প্লিট আনএ্যওয়েরনেস অফ শেখ মুজিবুর রহমান ফ্রম মার্চ টিল জানুয়ারি; যে দেশে এতো বড় একটা যুদ্ধ হচ্ছে।
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ও পরবর্তীতে ফায়সালাবাদের জেলে বসে শেখ মুজিবুর রহমান হ্যাড নো ক্লু যে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। বাট এগেইন হি ওয়াজ দ্যা সেন্ট্রাল রোল প্লেয়ার অফ দ্যা লিবারেশন ওয়ার অফ বাংলাদেশ।এন্ড দ্যা হিরো অফ এ্য নিউলি বর্ন কান্ট্রি।
কারন, খুবই পরিস্কার ঐ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে তাকে রিপ্লেস করবার মতো তেমন কোনো নেতা ছিলো না।
এবং আন্টিল দ্যা লিবারেশন ওয়ার ওয়াজ স্টারটেড, এ অঞ্চলের জনমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে হিজ রোল ওয়াজ আনকম্পেয়ারেবল।
ইতিহাস কখনও কাউকে ক্ষমা করে না – এটা একটা কমন প্রভার্ব। ১৯৭১ এর পর আওয়ামী লীগ সরকার, পরবর্তীতে বিএনপি সরকার, এছাড়া এরশাদ সরকার, কিংবা, বর্তমানের ইন্টেরিম সরকার – স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করতে বা এর ভুল ব্যাখ্যা দিতে প্রত্যেকের ভূমিকা আছে।
অথচ তাদের এই সেলফিশ মিথ্যাচার বা সত্য গোপনের চেষ্টার কারনে দেশ আজকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা ভাবতেই লজ্জা লাগে।
সম্প্রতি একটা ভিডিও সামনে পড়লো। কোনো একটা অনুষ্ঠানে এক জামাত কর্মী তার বক্তব্যে বলছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূর্য সন্তান নাকি মতিউর রহমান নিজামী আর গোলাম আজম।
ভিডিও টা দেখে দুই মিনিট আমার মাথা টা ভনভন করে ঘুরছিলো – ভাবছিলাম এটা কি শুনলাম। পরে ভাবলাম আসলে আজকের এই পরিস্থিতির জন্য জামাত/শিবিরের কোনো দোষ নেই। দোষ সবচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগের, তারপর বিএনপির।
এই দুই দলের নেতিবাচক নেতৃত্বের কারণেই আমরা আজকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
একটু পিছনে ফিরে তাকলেই দেখা যাবে, নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতায় যাবার সহায়ক হিসেবে উভয় দলই জামায়াতের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছিল, জামায়াতকে ব্যবহার করেছিলো। নিজের প্রয়োজনের সময় জামায়াত বন্ধু, আর প্রয়োজন ফুরালে জামায়াত রাজাকার – সত্যিই সেলুকাস!
আওয়ামী লীগের শাসনামলে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করলে দাগী আসামি। আর বিএনপি র শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করলে মহাপাপী।
নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লোভে নিজেদের প্রয়োজনে ইতিহাস বিকৃত করবার কারনে আজকে জামায়াত/শিবির বলবার সাহস পায় যে তাদের নেতারা ৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলো। অথচ বড় এই দুই দল যদি সত্য ইতিহাসের চর্চা করতো, মেচিওরড ডেমোক্র্যাটিক মেন্টালিটি বিলং করতো, করাপশনের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতো – তাহলে আজকে আমাদের দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের এই উত্থান দেখতে হোতো না।
অবশেষে কবির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলিঃ
“দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারো দানে পাওয়া নয়
দাম দিছি প্রাণ লক্ষকোটি জানা আছে জগৎময়।।
১৯৭১ সালে ষোলই ডিসেম্বর সকালে
অবশেষে দুঃখিনী এই বাংলা মা যে আমার হয়।।”
