০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, সোমবার
সাইফুল ইসলাম তানভীর
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। এমনটাই মনে করছেন অনেক মানুষ। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই একজন সম্মানিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে তিনি মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর বসুন্ধরায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অসুস্থতার সংবাদে দেশজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ালেও এর বিপরীতে তার সুস্থতা কামনায় কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির খালেদা জিয়াকে নিয়ে দোয়া অনুষ্ঠান করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও তার জন্য দোয়ার আয়োজন করেছেন। এছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও তার সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামিক দলের নেতারাও দোয়া করছেন।
অনেক মানুষের মধ্যেই উদ্বেগ ও কষ্ট রয়েছে—যদি বেগম খালেদা জিয়ার কোনো ক্ষতি হয়! দেশের অধিকাংশ মানুষই তাকে হারাতে চান না। হায়াতের মালিক আল্লাহ—এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ তার জন্য দোয়া করছেন। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কতটা গভীর।
বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, একাধিকবার সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন ফার্স্ট লেডি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী এবং বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসন। তবে অনেকের মতে, শুধু এসব পরিচয়ের কারণেই নয়—তার ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও নেতৃত্বগুণের কারণেই তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
মানুষ হিসেবে তারও ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে, তবে সমর্থকদের দাবি—তিনি কখনো দেশে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেননি, দেশ বিক্রির চেষ্টা করেননি এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তিনি দেশকে ভালোবাসেন, মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলেন এবং কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন না—এমনটাই মনে করেন তার অনুসারীরা।
বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে শৈশব থেকে অনেকের মতো আমিও খালেদা জিয়াকে সম্মান জানাই। তার রাজনৈতিক জীবনে যে নির্যাতন ও জুলুম হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল বলেও অনেকে মনে করেন। এক সময় চরম হিংস্র এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনা তাকে তারই নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করে। এ ঘটনাও সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার চরিত্র হননের উদ্দেশ্য তার বাসার ফ্রিজে মদ রেখে মিডিয়াকে দেখিয়েছে! বাসার ওয়াশ রুমের ছবি পোস্টার করে রাস্তায় ঘাটে লাগিয়েছে। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যেই তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ইন্তেকাল ঘটে। আমিও তার জানাজায় শরিক হয়েছিলাম অনেক কষ্ট করে। সে সময় তার জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের মতে, এটি ছিল মজলুম বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের ভালোবাসার বড় প্রমাণ।
সে সময় দেখেছি, আ’লীগের অনেক নেতাকর্মীই বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে। বিভিন্ন মঞ্চে ও সংসদে খালেদা জিয়াকে নিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার দলের লোকজন বারবার অশালীন ও বিশ্রী ভাষা ব্যবহার করেছেন।
১৯৯৬-২০০১ সালের সংসদেও আ’লীগের সাজেদা চৌধুরীসহ অনেকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় কথা বলেছেন। ওই সময়ে এমন একদিনও ছিল, যখন সংসদে সাজেদা চৌধুরীর বক্তব্য এতটাই অশালীন ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা অনুচিত।
স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাকর্মীরা প্রায়ই বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করতো। কিন্তু এত অপমান ও কটুক্তির পরও খালেদা জিয়া কখনো ক্ষিপ্ত হয়েও তার জবাব দেননি।
এছাড়াও, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মঞ্চ ও সংসদে তাকে নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তির ঘটনাও ঘটেছে। তবে, এসবের জবাবে তিনি খুব কম ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই নীরব সহনশীলতাও তাকে আলাদা একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে।
নব্বইয়ের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক জীবনে তার সাথে নিজের দলের অনেক নেতাই বিশ্বাসঘাতকতা ও মীর জাফরের ভূমিকা পালন করেছে। শত ষড়যন্ত্র, জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি কখনো নত হননি। কখনোই জনগণ এবং দলের নেতাকর্মীদের একা রেখে তিনি দেশ ছেড়ে যাননি, সাহস হারাননি। বরং দৃঢ় প্রত্যয়ে লড়ে গেছেন। বেগম খালেদা জিয়া আজ শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন নন,তিনি জাতীয় ঐক্যের এক শক্তিশালী প্রতীক।
যা আজও দেশের কোটি কোটি মানুষ তাকে যে ভালোবাসা দেখাচ্ছেন—তা কেবল লোক দেখানো নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত ও গভীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এই সংকটময় মুহূর্তে সবাই মহান আল্লাহর কাছে তার দ্রুত সুস্থতা ও দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।
