ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এয়ার টিকিট বাজার এখন মারাত্মক অস্থিরতার মুখে। গত কয়েক মাসে একের পর এক অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) প্রতারণার ঘটনায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণহীনতা, আইনি দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাবেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
গত দুই মাসেই অন্তত তিনটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি— ফ্লাইট এক্সপার্ট, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল ও ট্রাভেল বিজনেস পোর্টাল — হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় এবং শত শত কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক ও সাব-এজেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে টিকিট না দিয়ে প্রতারণা করেছে।
ফ্লাইট এক্সপার্টের মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা কোটি কোটি টাকার গ্রাহক অর্থ নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। একইভাবে ফ্লাই ফার ও ট্রাভেল বিজনেস পোর্টাল শতাধিক সাব-এজেন্টের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে। অনেক গ্রাহক আকর্ষণীয় ছাড় ও “ক্যাশব্যাক” অফারের প্রলোভনে পড়ে এইসব প্রতিষ্ঠানের কাছে টিকিট কিনেছিলেন, পরে জানতে পারেন টিকিটগুলো ভুয়া বা বাতিল।
নিয়ন্ত্রণহীন খাত ও সরকারি উদাসীনতা
ট্রাভেল এজেন্টদের শীর্ষ সংগঠন আটাব (Association of Travel Agents of Bangladesh) জানিয়েছে, অনলাইন প্রতারণা বন্ধে তারা বহুবার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আটাবের মহাসচিব আসফিয়া জান্নাত সালেহ বলেন, “অতিরিক্ত ছাড়, এডভান্স পেমেন্ট ও ক্যাশব্যাকের প্রলোভনে ওটিএগুলো গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে উধাও হচ্ছে। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের প্রতারণা এতটা ভয়াবহ হতো না।”
সরকার সম্প্রতি নতুন খসড়া আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে প্রস্তাব করা হয়েছে— অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ১ কোটি টাকা এবং অফলাইন এজেন্সির জন্য ১০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি বাধ্যতামূলক করা। একই সঙ্গে এক এজেন্সি যেন অন্য এজেন্সির কাছে (B2B) টিকিট বিক্রি না করতে পারে, তাও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
১ বিলিয়ন ডলারের এয়ার টিকিট বাজার ও ঝুঁকি
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫,০০০ ট্রাভেল এজেন্সি আছে, যাদের মধ্যে মাত্র ১,৩০০টি আইএটিএ অনুমোদিত। তবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে মাত্র ৭০০–৭৫০টি এজেন্সি। মাসে প্রায় ১,২০০–১,৩০০ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয় — বছরে যা ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
ওটিএগুলোর শেয়ার দ্রুত বাড়লেও এই সেক্টরে মনিটরিং ও স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। বাজারে ১২–১৫টি ওটিএ সক্রিয়, যার মধ্যে শেয়ারট্রিপ ও গোজায়ান তুলনামূলকভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে নতুন ও ছোট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো “কম দামে টিকিট” অফার দিয়ে সহজে গ্রাহক আকৃষ্ট করছে, যা পরে প্রতারণায় পরিণত হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা
ওটিএগুলোর অনেকে বড় অফলাইন এজেন্টদের কাছ থেকে ক্রেডিটে টিকিট কিনে থাকেন। অনেক সময় কোনো জামানত ছাড়াই কোটি টাকার টিকিট দেওয়া হয়, যা পরে অনিরাপদ হয়ে পড়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু দুর্বল ব্যবসায়িক আচরণ নয়, বরং অর্থ পাচার বা ট্যাক্স ফাঁকির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
একজন ট্রাভেল এজেন্ট সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “বেশি বিক্রি দেখিয়ে ট্যাক্স ফাইল ভারী করা, মালিকানা পরিবর্তন লুকানো ও এয়ারলাইন্স থেকে অতিরিক্ত কমিশন নেওয়ার জন্য এই কৃত্রিম লেনদেনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।”
এয়ার টিকিট বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা ও বিলম্বিত পদক্ষেপ
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অনেক ট্রাভেল এজেন্সি যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা করছে। এ কারণে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা বাড়ছে।
মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, ৬ নভেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে সব অনিবন্ধিত ওটিএকে ‘অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-এ নিবন্ধন করতে হবে।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল নিবন্ধন নয়, ব্যাংক গ্যারান্টি যাচাই ও মাসিক অডিট ব্যবস্থা না থাকলে এই প্রতারণা বন্ধ হবে না।
গ্রাহকদের জন্য সতর্কতা ও পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকিট কেনার সময় গ্রাহকদের কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে:
- অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সি থেকে টিকিট কিনুন।
- অচেনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অগ্রিম পেমেন্ট এড়িয়ে চলুন।
- ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে পেমেন্ট করুন, যাতে চার্জব্যাক সুবিধা থাকে।
- টিকিটের ইমেইল, রসিদ ও পেমেন্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন।
- সন্দেহ হলে সরাসরি এয়ারলাইনের সাথে যোগাযোগ করে টিকিট যাচাই করুন।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হলো সরাসরি এয়ারলাইন থেকে টিকিট কেনা। অন্যথায় মন্ত্রণালয়ের উচিত বি-টু-বি টিকিট বিক্রি বন্ধ করা।”
