আতিয়া ইবনাত রিফাহ্: পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি আমাদের বর্তমান বাস্তুতন্ত্র, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানা এক গুরুতর বৈশ্বিক ঝুঁকি। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণই এ পরিবর্তনের মূল কারণ। কিন্তু এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলা এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে গভীর বিভাজন ও ন্যায্যতার বিতর্ক চলছে, তা আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও দুরূহ করে তুলেছে।
পরিবেশগত ঝুঁকির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ: সংকটের গভীরতা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মানব সমাজ ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের বহু স্তরে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপ্রত্যাশিত বন্যা ও খরায় বিপর্যস্ত হচ্ছে উপকূলীয় ও নিম্নভূমি অঞ্চলগুলো। বাংলাদেশ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র যেমন টুভালু—এ ধরনের দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ুজনিত অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন শহরে অতিরিক্ত জনঘনত্ব, বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, কিন্তু এর মোকাবিলায় কার্যকর আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিক্ষেত্রেও গভীর। অপ্রত্যাশিত মৌসুমি পরিবর্তন, খরা ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে রোগ ও পোকামাকড়ের বিস্তার বেড়ে খাদ্যশৃঙ্খল আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। এর ফলে উন্নয়নশীল কৃষিনির্ভর দেশগুলো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, মূল্যবৃদ্ধি ও পুষ্টিহীনতার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। পাশাপাশি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, প্রবাল প্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস, এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া বিশ্ববাস্তবতাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের ওপর নতুন হুমকি সৃষ্টি করছে।
উত্তর–দক্ষিণ বিতর্ক: ঐতিহাসিক দায়, নৈতিকতা ও অর্থায়ন সংকট
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক ঐকমত্যের অভাব মূলত উত্তর–দক্ষিণ বিভাজনের ফল। শিল্পবিপ্লব থেকে এখন পর্যন্ত উন্নত দেশগুলো বিশ্বের অধিকাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে কম নির্গমন করেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ফলে গ্লোবাল সাউথ যুক্তি দেয় যে ধনী দেশগুলির অতিরিক্ত নির্গমন ‘কার্বন ঋণ’-এর সমান, যা তাদের পরিশোধ করতে হবে। এখান থেকেই “সাধারণ কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব” (Common but Differentiated Responsibilities) নীতির জন্ম।
এই নীতির আলোকে উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলিকে জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সাহায্য করতে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা স্পষ্ট। বরাদ্দ অর্থের বড় অংশ ঋণ আকারে আসে, যা দরিদ্র দেশগুলির ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় স্বতন্ত্র তহবিল গঠনের আলোচনাও দীর্ঘদিন স্থবির ছিল।
সাম্প্রতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (যেমন COP27 ও COP28) লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, এর অর্থায়ন ও পরিচালনা এখনও বিতর্কিত। উন্নয়নশীল দেশগুলো চায় এই তহবিল যেন অনুদানভিত্তিক হয় এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিতে পৌঁছে যায়। কিন্তু উন্নত দেশগুলির একাংশ এটিকে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে দেখতে নারাজ, কারণ এতে তাদের আইনি দায় তৈরি হতে পারে। তবুও, এই তহবিল জলবায়ু ন্যায্যতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে।
দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতা: নতুন জোট ও স্থিতিস্থাপকতার অনুসন্ধান
উত্তর–দক্ষিণ অচলাবস্থার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন সহযোগিতার পথ খুঁজছে, যা দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতা (South–South Cooperation) নামে পরিচিত। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন জলবায়ু অভিযোজন সংক্রান্ত জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে। জলবায়ু–সহনশীল ফসল বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি বিকাশে পরস্পরের সহায়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে, যা পশ্চিমা দেশগুলির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গ্লোবাল সাউথের দর–কষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন এমন এক সংকট যা কোনো দেশ একা সামাল দিতে পারবে না। এই বৈশ্বিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজন ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, ন্যায্যতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। ধনী দেশগুলোর উচিত দ্রুত কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা, লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল কার্যকর করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর সহজ করা। উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে আর রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং মানব অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখা সময়ের দাবি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য এখনই দরকার ন্যায্যতা ও সহযোগিতাভিত্তিক বৈশ্বিক পদক্ষেপ।
আরও পড়ুন: নারীবাদ: কেবল স্লোগান নয়, সমাজ বদলের সংগ্রাম
Find us on Facebook
