মো: ফয়সাল আহমেদ: দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। প্রায় ২০০ কোটি মানুষের এই অঞ্চলে ভারত, চীন, পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির প্রতিযোগিতা, সীমান্ত বিরোধ, পরমাণু অস্ত্রের উপস্থিতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রভাব এখানে একটি জটিল নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করেছে। এই সমীকরণের কেন্দ্রে বাংলাদেশ অবস্থান করছে তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। এই ভৌগলিক অবস্থান আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশ বাণিজ্য পথ, শক্তি পরিবহন এবং কৌশলগত সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৫ সালে, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারত-কেন্দ্রিকতা থেকে চীন, পাকিস্তান এবং অন্যান্য অংশীদারদের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা গতিবিদ্যাকে নতুন আকার দিচ্ছে। তবে এই জটিলতার মধ্যে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, মহাশক্তিগুলির প্রতিযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জ।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন। কাশ্মীর -কেন্দ্রিক ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, ভারত-চীনের সীমান্ত উত্তেজনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নয়ন, যেমন অস্ত্র চুক্তি এবং যৌথ সামরিক অনুশীলন, ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াড কৌশল এই অঞ্চলকে ২টি বলয়ে ভাগ করেছে। বাংলাদেশ, একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে, এই মহাশক্তিগুলির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে বাধ্য। বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০% সমুদ্রপথে পরিচালিত হওয়ায় এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি ইন্দো-প্যাসিফিকের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। তবে এই অবস্থান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপের ঝুঁকি ও বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতের সাথে সম্পর্ক। ঐতিহাসিকভাবে ভারত বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার, কিন্তু তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত বিরোধ এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত সহিংসতা, নেগেটিভ মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর ভারতের হাসিনা-সমর্থন এবং ভুল তথ্য প্রচার বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব বাড়িয়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১১% বাংলাদেশি ভারতের সাথে সম্পর্ককে ইতিবাচক মনে করেন, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে এটি ৭৫%। এই উত্তেজনা সীমান্ত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব আরেকটি চ্যালেঞ্জ। বিআরআই-এর অধীনে অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করলেও ঋণের ফাঁদ এবং কৌশলগত নির্ভরতার ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৫ সালে, ইউনুসের চীন সফরে সামরিক প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বৃদ্ধি ভারতের সাথে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
এছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ২০১৭ সাল থেকে ১১ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সীমান্ত অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে মিয়ানমারের অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও গভীর করেছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন শুধু মানবিক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এছাড়াও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নও উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস সত্ত্বেও, ২০২৪ সালে ইউনুস এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে সমুদ্র যোগাযোগ এবং সামরিক সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে। এটি ভারতের সাথে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
সমুদ্র নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং শক্তির শতভাগ পরিবহন করে, কিন্তু বন্দর নিরাপত্তা, মানব পাচার এবং জলদস্যুতার মতো অ-প্রথাগত হুমকি রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও একটি চ্যালেঞ্জ, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উগ্রবাদ এবং ২০২৪-এর বিপ্লবের পর দখলদারিত্বের সমস্যা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান, বন্যা এবং সাইক্লোন অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর এবং সম্পদ সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে, যা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি।
এই চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সুষম কৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়” নীতি অনুসরণ করে মহাশক্তিগুলির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীনের সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সাথে সমুদ্র সহযোগিতা, যেমন আধুনিক যন্ত্রপাতি অর্জন এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি, জোরদার করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে একক অংশীদারের উপর নির্ভরতা কমানো। জাপানের বিআইজি-বি প্রকল্পের মতো উদ্যোগে অংশগ্রহণ করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, সামরিক আধুনিকীকরণের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা। নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডকে শক্তিশালী করে পাকিস্তানের AMAN-25-এর মতো যৌথ অনুশীলনে অংশগ্রহণ করা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রেখে আন্তর্জাতিক ইমেজ উন্নয়ন করা যেতে পারে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক ফোরাম যেমন বিআইএমএসটিইসি এবং আইওআরএ-তে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে স্থিতিশীলতা প্রচার করা। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, জলবায়ু নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে তহবিল দাবি করে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমস্যা কেবল সীমান্ত বা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় না। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার সমন্বিত প্রশ্ন। এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক বিশ্বাস, সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতাই একমাত্র পথ। বাংলাদেশ তার শান্তিনির্ভর কূটনীতি, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি গঠনমূলক ও উদাহরণযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
*লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
