আতিয়া ইবনাত রিফাহ্: বর্তমানে বিশ্বের অর্থনীতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের টানাপোড়েন বিশ্ববাণিজ্যের চিরায়ত কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত থেকে শুরু করে বাণিজ্য যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা সবকিছুই বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্বায়ন থেকে বিচ্ছিন্নতার পথে: ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’-এর উত্থান
দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব অর্থনীতি ‘গ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়নের পথে হেঁটেছে, যার মূল ভিত্তি ছিল উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে সবচেয়ে কম খরচে কার্যকর করা। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এখন দেশগুলো কেবল অর্থনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের বাণিজ্যিক অংশীদার নির্বাচন করছে।
এই নতুন প্রবণতাকে অর্থনীতিবিদরা ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ বা ‘নিয়ার-শোরিং’ বলে অভিহিত করছেন। এর অর্থ হলো, কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কেন্দ্র এমন সব দেশে সরিয়ে নিচ্ছে, যাদের সঙ্গে তাদের সরকারের শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এর ফলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মেক্সিকো-এর মতো দেশগুলো উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তরের সুবিধা পেলেও, সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কারণ, রাজনৈতিক নিরাপত্তা সবসময় অর্থনৈতিক দক্ষতার সমার্থক নয়।
বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
বর্তমানে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Economic Sanctions) কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হলেও, এর প্রভাব গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
পাশাপাশি, আর্থিক খাতের ঝুঁকিও বেড়েছে। SWIFT ব্যবস্থা থেকে কিছু দেশকে বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যার ফলে অনেক দেশ ডলার-নির্ভরতা কমাতে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা খুঁজছে। এই অর্থনৈতিক হাতিয়ারের ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক ধরণের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
বহুপাক্ষিকতা থেকে আঞ্চলিক জোটের দিকে ঝোঁক
ভূ-রাজনৈতিক চাপ বহুদেশীয় বাণিজ্য সংস্থাগুলোর (যেমন: WTO) প্রভাবকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের অভাবের কারণে দেশগুলো এখন আঞ্চলিক বাণিজ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। আঞ্চলিক চুক্তিগুলো (যেমন: RCEP, CPTPP) আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটি ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে আঞ্চলিক ক্ষমতা ব্লক তৈরি করতে পারে, যা একসময়কার মুক্ত ও বহুদেশীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার বিপরীতে গিয়ে প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির সামনে নতুন সংকট
এই ভাঙাগড়ার খেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলো দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে। একদিকে, বিশ্বজুড়ে উচ্চ সুদের হার এবং অস্থিরতার কারণে তাদের জন্য ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো যদি শুধু নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে ব্যবসা করে, তাহলে ছোট ও নিরপেক্ষ অর্থনীতির দেশগুলো তাদের পুরোনো আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি একটি জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভেঙে দিচ্ছে এবং নতুন ধরনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের জন্ম দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করা, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং বহুমুখী অংশীদারিত্বের উপর জোর দেওয়া হবে। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে বিশ্বনেতাদের দ্রুত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।
*লেখক: গবেষক, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
