আজিজুল হাকিম রাকিব: সম্প্রতি “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা” নামের এক আন্তর্জাতিক নৌযাত্রা গাজা অভিমুখে রওনা হয়। এ নৌযাত্রায় প্রায় ৪০ টির বেশি নৌযান অংশ নেয়। এসব নৌযানে ছিলেন বিশ্বের প্রায় ৪৪ টি দেশ থেকে আগত প্রায় চারশতাধিক মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও শান্তিকর্মী। বিভিন্ন দেশের অইনপ্রনেতাও এ যাত্রায় অংশ নেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের আরোপ করা দীর্ঘদিনের অবরোধ ভেঙে গাজার মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরানো সেই অবরুদ্ধ উপকূলের দিকে, যেখানে প্রতিদিন মানবিক বিপর্যয় আর অমানবিক বাস্তবতা এক হচ্ছে।
তবে এই নৌযাত্রা সফলভাবে গাজায় পৌঁছাতে পারেনি। ইসরায়েলি নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার বহু আগেই তাদের ঘিরে ধরে, জাহাজগুলো আটকায় এবং যাত্রীদের বন্দি করে। অনেকেই একে “ব্যর্থ” অভিযান বলে তির্যক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: এই যাত্রা আসলেই কি ব্যর্থ ছিল? গাজাবাসী এতে কিছুই পেল না? ইসরায়েল কি বিন্দুমাত্র চাপে পড়েনি? নাকি এই যাত্রা এক নতুন ধরনের বার্তা দিয়েছে বিশ্বকে, যা সামরিক নয়, কিন্তু নৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী?
গাজাবাসীর জন্য এই যাত্রার লাভ খুঁজতে গেলে প্রথমেই বোঝা দরকার, এটি কোনো প্রচলিত মানবিক সাহায্য মিশন ছিল না। ফ্লোটিলার নৌযানগুলোতে যতটা ওষুধ বা খাদ্যসামগ্রী ছিল, তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল এর প্রতীকী তাৎপর্য। গাজায় পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল এক ধরনের বার্তা যে, বিশ্ব এখনো নীরব হয়ে যায়নি। যে বিশ্ব মিডিয়া, কূটনীতি আর রাজনীতির প্রতিযোগিতায় গাজার নিপীড়িত মানুষদের ভুলে গিয়েছিল, এই যাত্রা আবারও সেই ভুলে যাওয়া কণ্ঠকে শোনানোর চেষ্টা করেছে।
গাজাবাসী হয়তো হাতে কোনো খাদ্য বা ওষুধ পেল না, কিন্তু তারা পেল সহমর্মিতার বার্তা। অবরুদ্ধ জীবনের মধ্যে এমন একটি সংবাদ যে, পৃথিবীর দূর-দূরান্তে মানুষ তাদের জন্য সমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছে। এটি তাদেরকে মানসিকভাবে এক ধরনের শক্তি জুগিয়েছে। দীর্ঘদিনের নিরাশার মধ্যে এই সংহতি নিঃসন্দেহে আশার প্রতীক। তাই বস্তুগত না হলেও, মানসিক ও রাজনৈতিক অর্থে গাজাবাসী এই যাত্রা থেকে কিছু না কিছু পেয়েছে—স্মরণযোগ্যতা, সহমর্মিতা এবং বিশ্বজনতার সহানুভূতির পুনর্জাগরণ।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই নৌযাত্রাকে থামিয়ে দিয়ে সামরিকভাবে নিজেদের “নিয়ন্ত্রণ” বজায় রাখলেও, রাজনৈতিকভাবে তারা নিঃসন্দেহে চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইসরায়েলের এই আচরণকে দেখা হয়েছে এক ধরনের “ভয়ভিত্তিক প্রতিক্রিয়া” হিসেবে—যেন তারা মানবিক কণ্ঠের কাছেও আতঙ্কিত। বিশেষ করে, নৌযাত্রায় অংশ নেওয়া পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের আটক হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সুইডেন, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, তুরস্কসহ নানা দেশ ইসরায়েলের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একযোগে বলেছে; এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
ফলে, ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্ত থাকলেও নৈতিক অবস্থানে দুর্বল হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নানা পত্রিকা ও টকশোতে প্রশ্ন উঠেছে, একটি রাষ্ট্র কিভাবে মানবিক সহায়তা বহনকারী নৌযানকে “হুমকি” হিসেবে বিবেচনা করে? কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েল তার অবস্থান রক্ষার চেষ্টা করলেও, এই ঘটনাটি তাদের ভাবমূর্তিতে নতুন এক ফাটল ধরিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিসংখ্যান দিয়ে হয়তো তারা নিজেদের যুক্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বিবেকে এই আচরণকে ন্যায্য বলা মুশকিল।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার প্রকৃত সাফল্য তাই পৌঁছানোর মধ্যে নয়, বরং উচ্চারণের মধ্যে। “সুমুদ” শব্দের অর্থই হচ্ছে দৃঢ়তা বা অটল প্রতিরোধ। এই যাত্রা ছিল অস্ত্রবিহীন প্রতিরোধের প্রতীক—যেখানে জাহাজের মালামাল নয়, যাত্রীদের সাহসটাই ছিল আসল বার্তা। তারা প্রমাণ করেছে যে, মানবিকতার জন্য লড়াই করতে সামরিক শক্তি লাগে না, লাগে শুধু বিবেক আর ইচ্ছাশক্তি। এই নৌযাত্রা বিশ্বের মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই হয় না, সমুদ্রপথেও হতে পারে, কলমে হতে পারে, বা নীরবতাতেও হতে পারে।
এই যাত্রা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—গাজার অবরোধ শুধু ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি ইস্যু নয়, এটি পুরো মানবজাতির নৈতিক প্রশ্ন। যখন কোনো জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তখন সেটি শুধু একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি নয়, বরং মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। ফ্লোটিলার যাত্রীরা সেটিই স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন—গাজার মানুষ কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, তারা মানুষ, আর মানুষ হিসেবে তাদের বাঁচার অধিকার আছে।
অনেকে বলছেন, যেহেতু নৌযাত্রা গাজায় পৌঁছাতে পারেনি, তাই এটি “ব্যর্থ।” কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রতিটি বড় আন্দোলনের শুরুই এমন “ব্যর্থতা” দিয়ে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার এন্টি-এপারথেইড আন্দোলন, আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্ট কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—প্রথম পর্যায়ে সবই ছিল প্রতীকী প্রতিবাদ। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলাও সেই ধারারই এক সমুদ্র-সংস্করণ। এই যাত্রা হয়তো গাজায় পৌঁছায়নি, কিন্তু পৌঁছেছে বিশ্বের বিবেকে।
গাজাবাসীর হাতে কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি, কিন্তু পৌঁছেছে এক আশার বার্তা। ইসরায়েল হয়তো সমুদ্রে এই যাত্রা ঠেকিয়েছে, কিন্তু বিশ্বমনের দরজায় সেই ঢেউ ঠেকানো যায়নি। এই যাত্রা দেখিয়ে দিয়েছে, মানবতা এখনো বেঁচে আছে—তার নৌকা হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু তার বার্তা থেমে নেই।
সমুদ্রের ঢেউ একদিন থেমে যায়, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় দীর্ঘদিন। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার যাত্রাও তেমনই এক প্রতিধ্বনি, যা হয়তো আজ নীরব, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি একদিন সাক্ষ্য হয়ে থাকবে যে, যুদ্ধের আগুনে পোড়া পৃথিবীতেও কিছু মানুষ এখনো মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে জানে।
*লেখক: গবেষক, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
