ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল আগামী বছরের শুরু থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, মার্চ বা এপ্রিল থেকে নতুন স্কেল কার্যকর করতে হলে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে, যা ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে।
নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে সরকার ইতোমধ্যে একটি পে কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই সুপারিশ চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। কমিশনের সদস্যদের মতে, চিকিৎসা ভাতা ও শিক্ষা ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি ডাক্তার, প্রকৌশলী, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনামূলক ভাতা প্রস্তাব করা হবে।
বর্তমানে সর্বোচ্চ গ্রেড-১ এবং সর্বনিম্ন গ্রেড-২০-এর বেতনের অনুপাত প্রায় ১০:১। কমিশন পর্যালোচনা করে দেখেছে যে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য দেশেও এ অনুপাত ৮:১ থেকে ১০:১ এর মধ্যে রয়েছে। তাই নতুন কাঠামোতেও অনুপাত একই সীমার মধ্যে রাখা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ২০টি গ্রেড কমানো হলেও সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।
এছাড়া, বর্তমান পে কমিশন পদোন্নতির প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাব দিতে পারে। ২০১৫ সালের ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বাতিল করা হয়েছিল এবং ১০ বছর পর স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু হয়। এবারও একই ধরনের সংস্কার আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন ভাতার প্রস্তাবনাও আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে একজন সরকারি কর্মচারী চাকরির শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত মাসে মাত্র ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন প্রস্তাবে এই ভাতা বাড়ানো এবং অবসরের পর অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা ভাতাও বাড়ানো হবে।
কমিশন মনে করছে, নতুন বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বর্তমানে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল। তাই ব্যবসায়ী সংগঠন ও চেম্বারগুলোর সঙ্গে অক্টোবর মাসে মতবিনিময় করবে কমিশন। ইতোমধ্যে ৪৫টি শিল্প খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করেছে সরকার। কমিশন সুপারিশ করবে, এসব খাতের মজুরি জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হোক।
বিশেষ করে গবেষণা, চিকিৎসা ও প্রকৌশল পেশায় দক্ষ জনবল ধরে রাখতে নতুন কাঠামোয় বিশেষ প্রণোদনা ভাতা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কারণ বর্তমানে অনেক তরুণ এসব বিষয়ে পড়াশোনা করলেও অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। ফলে দেশে ডাক্তার, প্রকৌশলী ও গবেষকের সংকট তৈরি হচ্ছে, যা উদ্ভাবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন পান। সশস্ত্র বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের যুক্ত করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ। তাদের বেতন-ভাতা ২০১৫ সালের কাঠামো অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়বে, যা ভোগ বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তবে বেসরকারি খাতে চাপ তৈরি হলে বিনিয়োগে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল শুধু আয় বৃদ্ধিই নয়, বরং চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে মেধা ধরে রাখারও একটি কৌশল হতে যাচ্ছে।
