নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো এক জটিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ-সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি এবং মানবিক সংকটের ভিড়ে এবার অধিবেশনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফিলিস্তিন প্রশ্ন। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের ভাষণে মানবতার দায়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।
অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা ছিল বিস্তৃত। বিশেষত ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তাদের অস্তিত্ব সংকট তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সহায়তার আবেদন জানায়।
এছাড়া দারিদ্র্য, বৈশ্বিক বৈষম্য, অভিবাসন ও শ্রমিক অধিকার নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশ তাদের অভিবাসী শ্রমিকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবিও তোলে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর বক্তব্যে ন্যায়বিচার, সংস্কার ও নতুন করে বৈশ্বিক সংহতির বার্তা তুলে ধরেন।
তবে এসব আলোচনার ভিড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ফিলিস্তিন সংকট। দীর্ঘদিন ধরে চলা দখল ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এবার জাতিসংঘ অধিবেশনে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও পর্তুগাল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এই ঘোষণাকে অনেকেই কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের অবস্থান দৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এই স্বীকৃতির মধ্যেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও গাজার বাস্তবতা এখনো ভয়াবহ। ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন, বসতি স্থাপন নীতি, অবরোধ ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। গাজায় সাম্প্রতিক আক্রমণে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু স্বীকৃতি যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপ্রধান মাহমুদ আব্বাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভিসা না পাওয়ায় অনলাইনে বক্তব্য দেন। তিনি তাঁর ভাষণে ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গাজায় চলমান গণহত্যার বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এই সংকট এক অবসানহীন দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা ছিল— শুধুমাত্র সহানুভূতি প্রকাশ নয়, বরং বাস্তব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই জরুরি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর ভাষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধ বন্ধ করতে হবে। তিনি রোহিঙ্গা সংকটসহ বিশ্বের অন্যান্য মানবিক বিপর্যয় নিয়েও মন্তব্য করেন, তবে তাঁর সবচেয়ে তীব্র বক্তব্য ছিল গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে। গুতেরেসের মতে, ন্যায়ভিত্তিক সমাধান ছাড়া টেকসই শান্তি সম্ভব নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণ ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বহু দেশের প্রতিনিধিদল তাঁর বক্তব্য চলাকালীন অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও সেদিন সভাকক্ষে প্রবেশ করেননি। এই প্রতীকী প্রতিবাদ প্রমাণ করে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক ক্ষোভ জমে উঠেছে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলকে দায়ী করবে? স্বীকৃতি দেওয়ার পরও যদি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও দমননীতি চলতে থাকে, তবে এর কোনও বাস্তব সুফল ফিলিস্তিনি জনগণ পাবে না। অনেক মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে ইসরায়েলের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা ছাড়া ফিলিস্তিনের জন্য ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি কূটনৈতিক লড়াইয়ের বড় অর্জন, যা নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনি জনগণের মনোবল বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু বাস্তবে মুক্তি, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত করতে হলে ইসরায়েলকে তাদের গণহত্যা ও দমননীতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দায়বদ্ধ করতে হবে। শুধু ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে যদি ইসরায়েলের জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তবে তা প্রতীকী পদক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে। প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই উদ্যোগ ইতিহাসে অর্ধেক সত্য হয়ে থাকবে।
