বিশ্ব মহাকাশ অভিযানের এক অনন্য নক্ষত্র, নাসার কিংবদন্তি অ্যাস্ট্রোনট জেমস ‘জিম’ লোভেল এখন আর আমাদের সঙ্গে নেই। ৭ আগস্ট ইলিনয়সের লেক ফরেস্টে ৯৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই মহাকাশগামী। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নাসা।

ইতিহাস গড়া মহাকাশ অভিযান ও সাহসিকতা
জিম লোভেল ছিলেন নাসার অন্যতম বিখ্যাত ও অভিজ্ঞ মহাকাশচারী, যিনি চারটি মহাকাশ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন—জেমিনি ৭, জেমিনি ১২, অ্যাপোলো ৮ এবং অ্যাপোলো ১৩। ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশন ছিল তাঁর ক্যাপ্টেন হিসেবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিযান, যেখানে এক অক্সিজেন ট্যাঙ্ক বিস্ফোরণের কারণে চাঁদে অবতরণ বাতিল করে নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩২২,০০০ কিলোমিটার দূরে এই দুর্ঘটনার পর তিনি শান্ত মস্তিষ্কে “হিউস্টন, আমাদের সমস্যা হয়েছে” বলে মিশন কন্ট্রোলকে খবর দেন। সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় মহাকাশ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ফেরার গল্প।

অ্যাপোলো ১৩ ক্রু—জিম লাভেল, জন সুইগার্ট জুনিয়র এবং ফ্রেড হাইজ জুনিয়র—তিনজনই চাঁদে অবতরণের স্বপ্ন ত্যাগ করে, চাঁদের পেছনের দিকে অরবিট করে বিপদসঙ্কুল অবস্থার মধ্য থেকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। এই অভিযান নাসার ইতিহাসে “সফল ব্যর্থতা” হিসেবে পরিচিত, যেখানে কঠিনতম পরিস্থিতিতেও জীবন রক্ষার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়।
জীবন ও কর্মে মহাকাশ যোদ্ধার অবদান
জিম লোভেল নাসার দ্বিতীয় ব্যাচের ৯ জন মহাকাশচারীর একজন হিসেবে ১৯৬২ সালে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী বেশ কয়েকটি মিশনে যাত্রা করেন। তিনি প্রথম মহাকাশচারী যিনি চারবার মহাকাশ সফর করেছেন এবং মোট ৭১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় মহাকাশে কাটিয়েছেন। তাঁর অ্যাপোলো ৮ মিশনে, যা চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসার প্রথম ক্রুডেড অভিযান ছিল, তিনি চাঁদের দূরবর্তী পাশে পৌঁছে নতুন ইতিহাস রচনা করেন।
২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীকে এত ক্ষুদ্র দেখার পর তাঁর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল। তিনি পৃথিবীকে তাঁর থাম্বের আড়ালে ঢাকা দিতে পারতেন এবং অনুভব করতেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন তার পেছনে লুকানো।

অ্যাপোলো ৮-এর বড়দিনের রাতে, তিনজন মহাকাশচারী বাইবেলের সৃষ্টির বই থেকে পাঠ করেন এবং প্রায় ৬৪টি দেশে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ তাদের কথা শুনেছিল। একই দিন, লাভেলের সহযাত্রী উইলিয়াম অ্যান্ডার্স চাঁদের আকাশ থেকে পৃথিবীর ঐতিহাসিক “আর্থরাইজ” ছবি তুলেন, যা পরিবেশ আন্দোলনের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।
কৃতিত্ব ও সন্মাননা
জিম লোভেল পেশাগত জীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। অ্যাপোলো ১৩ মিশনের সফল ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি প্রেসিডেন্টিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম পান। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত তিনি হুস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি মার্কিন মহাকাশচারী হল অফ ফেম-এ অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁকে কংগ্রেসনাল স্পেস মেডেল অফ অনার প্রদান করেন।
বিশ্বখ্যাত মহাকাশচারী বাজ অ্যালড্রিন এক শোকবার্তায় বলেন, “আমার প্রিয় বন্ধু ও সহযোদ্ধা জিম লোভেলকে হারিয়ে আমি গভীর শোকাহত। তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ার ছিল আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।”
অনুপ্রেরণার মানুষ
জিম লোভেল কখনো চাঁদে পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু তাঁর সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা এবং নেতৃত্ব মানুষকে চাঁদ ও তার বাইরের জগত সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখিয়েছে। তিনি নিজে একবার হেসে বলেছিলেন, “দুইবার বিয়ের সাজে থিয়েও আমি কনে হতে পারিনি”—অর্থাৎ দুইবার চাঁদ ঘুরে এসেও অবতরণ হয়নি তার।
নাসার বর্তমান মুখপাত্র শোন ডাফি বলেছেন, “লোভেল ঠাণ্ডা মাথা, সঠিক সময়ে নেওয়া দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং উদ্ভাবনী চিন্তা ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানে পথ প্রদর্শক ছিল।”
আমাদের প্রেরণা, আমাদের নায়ক
বাংলাদেশ সহ গোটা পৃথিবীর মানুষ জিম লোভেলর জীবন ও কাজ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে—সাহস, ধৈর্য, সংকট মোকাবেলায় শান্ত মস্তিষ্কের গুরুত্ব এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার মনোভাব। তিনি চিরকাল মানব ইতিহাসের মহাকাশ অভিযানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
